অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। বুধবার সংসদ অধিবেশনে কণ্ঠভোটে বিলটি অনুমোদিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিলের ওপর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান আপত্তি জানালেও তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
নতুন এই আইন পাসের মাধ্যমে বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইনের বিধান অনুযায়ী, এতদিন ধরে আলাদাভাবে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ নামক একটি একক সংস্থা গঠন করা হবে। এই নতুন কর্তৃপক্ষ এখন থেকে দেশের প্রধান বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
মূলত বিনিয়োগকারীদের সেবাপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা নিরসন এবং বিভিন্ন দপ্তরে ধাপে ধাপে অনুমোদনের জটিলতা দূর করাই এই আইনের মূল লক্ষ্য। প্রস্তাবিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’-এর আওতায় বিনিয়োগ অনুমোদন, নিবন্ধন, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সুবিধা প্রদান, প্রণোদনা ব্যবস্থাপনা, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াকে একটি একক কাঠামোর (সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স) আওতায় আনা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে দ্রুত সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
আইনে উল্লিখিত বিধানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিনিয়োগ ও ব্যবসাসংক্রান্ত যাবতীয় সেবা একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। এর ফলে অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত হবে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি করবে। এছাড়া আইনের আওতায় দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল এবং ঘোষিত শিল্পাঞ্চলসমূহকে একই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অধীনে আনা হয়েছে। বিভিন্ন লাইসেন্স ও অনুমোদনের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অব্যবহৃত সরকারি জমি, স্থাপনা ও অন্যান্য সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতেও নতুন আইনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র পিপিপি প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির আওতা সম্প্রসারণের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে নতুন আইনটিতে বিদেশি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগের নীতিমালা, ভিসা সুপারিশ, কর্মানুমতি প্রদান এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো বিষয়গুলোতেও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্য সরকারের রয়েছে, তা অর্জনে এই আইনটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে গত ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিলটির খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। সংসদীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আইনটি পাস হওয়ার ফলে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন হয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।


