নকশাগত ত্রুটিতে বন্ধ হচ্ছে বিআরটি প্রকল্প, করিডোর উন্মুক্ত হচ্ছে সব যানবাহনের জন্য

নকশাগত ত্রুটিতে বন্ধ হচ্ছে বিআরটি প্রকল্প, করিডোর উন্মুক্ত হচ্ছে সব যানবাহনের জন্য

অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক

বিমানবন্দর-গাজীপুর করিডোরে বিপুল ব্যয়ে নির্মিত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) অবকাঠামোটি বিআরটি ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশের সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার সুপারিশ করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় গঠিত দুটি কমিটি। একই সাথে প্রকল্পটির নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার তাগিদ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘রিভিউ কমিটি’ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে একই ধরনের মত পোষণ করেছে।

সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রথম বিশেষ লেনভিত্তিক বাস চলাচল ব্যবস্থা বা বিআরটি প্রকল্পটি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হবে। এই পরিস্থিতিতে নির্মাণ ব্যয় ও বিদেশী ঋণ তুলে আনতে করিডোর ব্যবহারকারী সাধারণ যানবাহন থেকে টোল আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। সার্বিক উন্নয়ন ও আর্থিক সংশ্লেষ বিবেচনায় নিয়ে এই মেগা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়টি এখন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে এটি শিগগিরই মন্ত্রিপরিষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে।

ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত দ্রুতগতির নিরবচ্ছিন্ন গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালে বিআরটি প্রকল্প হাতে নেয় তৎকালীন সরকার। মেট্রোরেলের মতো যানজটহীন যাতায়াত সুবিধা দেয়াই ছিল এই ডেডিকেটেড বাস লেনের মূল লক্ষ্য। প্রায় সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রায় শতভাগ অবকাঠামো নির্মিত হওয়ার পর এখন এর গুরুতর নকশাগত ও পরিচালনাগত জটিলতার কথা উল্লেখ করে প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য বন্ধের সুপারিশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল এলাকাগুলো বিআরটি ব্যবস্থার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। করিডোরের অনেক অংশে পর্যাপ্ত সার্ভিস রোড ও ফুটপাত রাখা হয়নি। পাশাপাশি সড়কের মাঝখানে বাসের জন্য মাত্র দুটি লেন নির্দিষ্ট করে দেয়ায় সাধারণ যান চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একটি কার্যকর বিআরটি ব্যবস্থা সচল করার জন্য সড়ক যে পরিমাণ প্রশস্ত হওয়া প্রয়োজন, এই প্রকল্পে তা নিশ্চিত করা যায়নি। এই ত্রুটিপূর্ণ নকশা নিয়ে বিআরটি পুরোপুরি চালু করা হলে ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলমুখী পাশের সাধারণ লেনগুলোতে তীব্র যানজট সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

এমন বাস্তবতায় বিপুল অর্থের অপচয় রোধে করিডোরটিকে একটি উন্নত দ্রুতগতির সাধারণ সড়ক (এক্সপ্রেসওয়ে) হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কমিটিগুলোর মতে, সরকার চাইলে এই লেনে চলাচলকারী সাধারণ যানবাহন থেকে টোল আদায় করতে পারে, যা প্রকল্পের জন্য নেয়া বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সহায়তা করবে। এর জন্য টঙ্গী ওভারপাস এলাকায় টোল প্লাজা স্থাপন এবং নির্মিত বিআরটি স্টেশনগুলোকে সামান্য সংস্কার করে টোল বুথে রূপান্তর করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

এদিকে, নকশাগত এই বিপর্যয়ের জন্য প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দায়ী করে তাদের আইনগত জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করেছে রিভিউ কমিটি। প্রকল্পটির মূল অবকাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্বে যৌথভাবে ছিলেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা। দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান জানান, সরকারের বিদ্যমান সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ও নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রকল্পটিতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি ইন্টারন্যাশনাল ও ব্রিসবেন সিটি এন্টারপ্রাইজ, ফ্রান্সের সিস্ট্রা এসএ এবং বাংলাদেশের এসিই কনসালট্যান্স লিমিটেড। তাদের মূল দায়িত্ব ছিল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সমন্বয়, প্রকৌশল ও নির্মাণ কার্যক্রমের নিবিড় তত্ত্বাবধান। অন্যদিকে, বিআরটি করিডোর পরিচালনা ও এর ব্যবসায়িক বা অপারেশনাল মডেল তৈরির দায়িত্ব যৌথভাবে পেয়েছিল ভারতের সিইপিটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন। তবে নকশা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি দৃশ্যমান হওয়ায় পরবর্তী সময়ে এই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রকল্প থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।

ব্যবসায়িক মডেল তৈরির কাজে যুক্ত থাকা বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং রিভিউ কমিটির প্রধান ড. সামছুল হক জানান, অপারেশনাল মডেল বাস্তবায়নের পথে গুরুতর ও অবাস্তব সমস্যাগুলো অনুধাবন করতে পেরেই তারা আগেভাগে সরে এসেছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে এই ব্যর্থতার দায় বিশেষজ্ঞ দলের ওপর না বর্তায়।

কমিটির সুপারিশ ও মেগা প্রকল্পটির বর্তমান অচলাবস্থা প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে নিবিড় পর্যালোচনা চলছে। বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত বা একতরফা সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনার সুবিধার্থে বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দেশের পরিবহন খাত ও জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে সেখান থেকেই চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা আসবে।

সৌজন্যে বণিক বার্তা

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ