আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান তীব্র উত্তেজনার মাঝে ইরানকে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তেহরান দ্রুত কোনো সমঝোতায় না এলে দেশটির জন্য চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, “ওদের (ইরানকে) দ্রুত এগোতে হবে। না হলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।” মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের প্রস্তুতি চলছিল।
এদিকে, তেহরানের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলমান সংকট নিরসনে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের বিপরীতে ওয়াশিংটন কোনো সুনির্দিষ্ট ছাড় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, মার্কিন প্রশাসনের এই অনমনীয় মনোভাব এবং সমঝোতার সদিচ্ছার অভাবই আলোচনাকে বর্তমান অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। চলমান এই কূটনৈতিক জটিলতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে আবারও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিতে ফেলছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘদিন ধরে চলা বৈরিতার পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ওই সামরিক অভিযানের পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। পরবর্তীতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হলেও এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল রয়ে গেছে। বর্তমান অচলাবস্থা সেই ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকেও নসাৎ করার উপক্রম করেছে।
কূটনৈতিক স্তরে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইরানের পক্ষ থেকে মূলত চারটি মূল শর্ত দেওয়া হয়েছে। তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—চলমান সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করা, মার্কিন নৌবাহিনীর আরোপিত অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কোনো ধরনের হামলা চালানো হবে না—এমন আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা প্রদান এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হওয়ায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা তেহরানের জন্য একটি অন্যতম প্রধান ভূরাজনৈতিক কার্ড।
বিপরীতে, ওয়াশিংটন ইরানের এই দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব পাঁচ দফা শর্তজুড়ে দিয়েছে। মার্কিন শর্তানুযায়ী, ইরানকে তাদের বর্তমান পরমাণু কর্মসূচির পরিধি ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে কেবল একটিমাত্র পারমাণবিক স্থাপনা চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হবে। একই সাথে, ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সম্পূর্ণ মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তবে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন, ইরান যদি আগামী ২০ বছরের জন্য তাদের সমস্ত পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে সম্মত হয়, তবে ওয়াশিংটন শর্তাবলীতে কিছুটা নমনীয়তা বিবেচনা করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরমাণু সমৃদ্ধকরণ ও আঞ্চলিক জলপথের নিয়ন্ত্রণ—এই দুই প্রধান ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে থাকায় চলমান আলোচনা গভীর সংকটে পড়েছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত সুবিধা বজায় রাখার বিষয়ে ইরানের অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করছে। আগামী দিনগুলোতে দুই পক্ষ কোনো মধ্যস্থতায় পৌঁছাতে না পারলে, এই অঞ্চলের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে।


