অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
করজাল সম্প্রসারণ ও নিত্যপণ্যে ছাড়ের ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার এবং করের আওতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বহুমুখী করছাড় ও শুল্ক আরোপের কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষিত এই বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি, দেশীয় ওষুধ শিল্প, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) খাতে ব্যাপক শুল্ক-কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে করজাল সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সাধারণ করদাতা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর কিছু ক্ষেত্রে করের বাধ্যবাধকতা ও অগ্রিম করের বোঝা আরোপ করা হচ্ছে।
করজাল সম্প্রসারণ ও সাধারণ করদাতাদের ওপর প্রভাব
রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি মজবুত করতে আগামী বাজেটে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে যেকোনো নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের করছাড় দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নো ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট (যেমন: ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব), সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত ভাতাভোগী এবং পেনশনভোগীদের ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। বর্তমানে দেশে ১৭ কোটিরও বেশি ব্যাংক হিসাব রয়েছে, যা থেকে বিপুলসংখ্যক নাগরিককে করজালের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, পূর্বঘোষণা অনুযায়ী করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। তবে করপোরেট করহার অপরিবর্তিত থাকছে। ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক আরোপের প্রারম্ভিক সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হচ্ছে। তবে ঋণের টাকার ক্ষেত্রে কেবল একবারই আবগারি শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
ব্যবসায়িক খাতে করের পরিধি বাড়াতে দেশের প্রায় ৭০ লাখ খুচরা বিক্রেতার ওপর নতুন অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, খুচরা বিক্রেতারা যখন পণ্য সরবরাহকারী বা পরিবেশকদের কাছ থেকে মালামাল কিনবেন, তখন প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা (০.২ শতাংশ) হারে অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে, যা পরিবেশকেরা সরকারি কোষাগারে জমা দেবেন।
নিত্যপণ্য, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীতে বড় ছাড়
বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের স্বস্তি দিতে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ওপর বিদ্যমান উৎসে কর ১ থেকে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় কমাতে হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হার্টের রিংয়ের জোগানদার পর্যায়ের ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে, যার ফলে প্রতিটি রিংয়ের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। চোখের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর থেকে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে লেন্সপ্রতি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে। এ ছাড়া কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর এবং হেমোডায়ালাইসিসের ব্লাড টিউবিং সেট আমদানির ক্ষেত্রে ৭.৫ শতাংশ ভ্যাটের আগাম কর তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, যা ডায়ালাইসিস প্রতি রোগীর খরচ প্রায় ৮০০ টাকা কমাবে। শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ এবং মরচুয়ারি আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে।
দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে এবং ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের সাশ্রয়ী উৎপাদন নিশ্চিত করতে কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় আরও ৯টি পণ্য যুক্ত হচ্ছে। ওষুধ রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল এই সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এবং অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রণোদনা
তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র (গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ও যন্ত্রাংশ) আমদানির ওপর থেকে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। চলচ্চিত্রের কারিগরি মানোন্নয়নে উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে তাদের সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় পর্যায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট, সেবা আমদানির ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা বহাল থাকছে।
পরিবেশবান্ধব যানবাহন ও সোনা বিপণন ব্যবস্থা
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানিতে সার্বিক শুল্ক-কর উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হচ্ছে। ২৫ হাজার ডলার মূল্যের ইভির শুল্ক-কর ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের ইভির ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রিম করের পরিমাণ ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে গাড়ির কিলোওয়াট (২০০ থেকে ৪০০+ কিলোওয়াট) ভেদে যথাক্রমে ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার ও ১ লাখ টাকা করা হচ্ছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকবে। পাশাপাশি ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানির সব শুল্ক-কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
স্বর্ণালংকার খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বিক্রয়মূল্যের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ ভ্যাট তুলে দিয়ে ভরিপ্রতি নির্দিষ্ট ২৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা ক্রেতাদের গয়না কেনার খরচ কমাবে। স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে করও ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
প্রস্তাবিত এই বাজেট প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “সরকার দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে এবং এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে শুল্ক-কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং এর ফলে দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা যেন কেবল বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণে করের হার বাড়ানোর চেয়ে করজাল সম্প্রসারণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া আবশ্যক।


