আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সংঘাত, সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২০২৫ সালে এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো হ্রাস পেয়েছে। তবে সামগ্রিক সংখ্যা কমলেও গত বছর নতুন করে ৫৪ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী বা শরণার্থীসদৃশ পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ১৬ লাখে। যার মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী রয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) প্রকাশিত সংস্থাটির প্রতিবেদনে বৈশ্বিক বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতির এই চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি নিজ নিজ স্থায়ী নিবাসে ফিরে গেছেন। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এই প্রত্যাবর্তনের হার প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি, যা ১৯৬৫ সালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রত্যাবর্তনের ঘটনা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ ও সহিংসতা কবলিত দেশগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। এর মধ্যে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, সুদান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইউক্রেন ও মিয়ানমার অন্যতম। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই এসব মানুষ নিজ দেশে চরম নিরাপত্তাহীনতা, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং মৌলিক নাগরিক সেবার তীব্র সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
ইউএনএইচসিআর-এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে প্রায় ২৯ লাখ আফগান নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন, যাদের মধ্যে ১৯ লাখই ছিলেন শরণার্থী। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়াতেও প্রত্যাবর্তনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর প্রায় ১৩ লাখ সিরীয় নাগরিক নিজ দেশে ফিরে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা হ্রাসের এই প্রবণতাকে ইতিবাচক মনে করা হলেও ইউএনএইচসিআর সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট এখনো অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ শরণার্থী পাঁচ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে নিজ দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন বা নির্বাসিত অবস্থায় রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই সংকটগুলো স্থায়ী সমাধানের অভাবে মানবিক বিপর্যয়কে আরও ঘনীভূত করছে।
এই বিষয়ে ইউএনএইচসিআর-এর হাইকমিশনার বারহাম সালিহ বলেন, “আশ্রয় ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষা মানুষের জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কোনোভাবেই এমন পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে লাখ লাখ শরণার্থী বছরের পর বছর ধরে নিজেদের জীবন পুনর্গঠনের সুযোগ ছাড়াই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হন।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলমান এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংস্থাটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী এবং মানবিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর, যাতে তারা কেবল ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল না থেকে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেন।


