জাতীয় প্রশাসন ডেস্ক
রাজধানী ঢাকায় আজ রবিবার থেকে শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন ২০২৬। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। মাঠ পর্যায়ের শাসনব্যবস্থা সুসংহত করা, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করা এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদানই এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য। এবারের সম্মেলনে দেশের আটটি বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের পক্ষ থেকে মোট ৪৯৮টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করা হচ্ছে।
শনিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সম্মেলনের বিস্তারিত কার্যসূচি তুলে ধরেন অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, বিগত বছরগুলোতে এই সম্মেলন তিন দিনব্যাপী হলেও প্রশাসনিক গুরুত্ব ও আলোচনার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবার তা চার দিনে উন্নীত করা হয়েছে। সম্মেলনে দেশের ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে জেলা প্রশাসকদের নিজ নিজ দপ্তরের অগ্রাধিকার ও করণীয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবেন। মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকদের এই সরাসরি মতবিনিময় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে গতিশীলতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবারের সম্মেলনে মোট ৩৪টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ৩০টি হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সংশ্লিষ্ট কার্য অধিবেশন। মাঠ প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত মোট ১ হাজার ৭২৯টি প্রাথমিক প্রস্তাবের মধ্য থেকে যাছাই-বাছাই শেষে ৪৯৮টি প্রস্তাবকে মূল কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলোর বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ৪৪টি প্রস্তাব এসেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সংক্রান্ত। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় জেলা প্রশাসকরা অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের মতো বিষয়গুলো এবারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাস্তবায়ন, ই-গভর্নেন্স ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে জেলা প্রশাসকরা তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরবেন। মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র সরাসরি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর ফলে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্মেলনের বিশেষ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ৩ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে, ৪ মে সন্ধ্যা ৭টায় জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে এবং ৫ মে বিকেল ৪টায় সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পৃথক সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে। এসব সেশনে জেলা প্রশাসকরা মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং রাষ্ট্রের আইন ও বিচার বিভাগীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে দিকনির্দেশনা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। এটি প্রশাসনের তিন স্তম্ভের মধ্যে সমন্বয় সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, জেলা প্রশাসক সম্মেলন মূলত সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে তৃণমূলের একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। মাঠ প্রশাসনের আইনগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জগুলো সরাসরি সরকারের শীর্ষ মহলে উপস্থাপন করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে অবকাঠামো উন্নয়ন তদারকি এবং সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা অপরিসীম। এই সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকরা তাদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগামী বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন।
অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির সংবাদ সম্মেলনে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো এবং মাঠ পর্যায়ের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধানের পথ প্রশস্ত হবে। এর ফলে সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যেমন গতিশীলতা আসবে, তেমনি উন্নয়ন কার্যক্রমের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সামগ্রিকভাবে নাগরিক সেবাকে আরও সহজলভ্য ও হয়রানিভুক্ত করার লক্ষ্যেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ৫ মে সমাপনী অধিবেশনের মধ্য দিয়ে এই চার দিনব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সভার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।


