গণমাধ্যম সংস্কারে স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠনের গুরুত্বারোপ তথ্যমন্ত্রীর

গণমাধ্যম সংস্কারে স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য কমিশন গঠনের গুরুত্বারোপ তথ্যমন্ত্রীর

জাতীয় ডেস্ক

দেশে একটি স্বাধীন, দক্ষ এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম কমিশন গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, গণমাধ্যম পরিচালনায় কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে মতবিনিময় প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।

আজ রবিবার (১৭ মে) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্পাদক ও সংবাদ প্রধানদের শীর্ষ সংগঠন ‘টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল’ (টিইসি)-এর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকে দেশের গণমাধ্যম খাতের সামগ্রিক সংকট, কাঠামোগত সংস্কার, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ক্রটিগুলো চিহ্নিত করে বলেন, এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি গভীর ‘ধারণাগত ঘাটতি’ বিদ্যমান ছিল। গণমাধ্যমের মালিক, উদ্যোক্তা, পেশাদার সাংবাদিক এবং সরকারের মধ্যে এই শিল্পকে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বিত চিন্তাভাবনার সুনির্দিষ্ট অভাব লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে বিকাশমান এই খাতটি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার মধ্যে না এসে, অনেকাংশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব, পুঁজির অসম বিনিয়োগ ও ক্ষমতার বলয় দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গণমাধ্যম এমন একটি খাত যেখানে সরকার নিজেও অন্যতম একটি অংশীজন। তাই সরকারকে একদিকে যেমন নিজের প্রশাসনিক ও আইনি দায়িত্ব পালন করতে হবে, অন্যদিকে তেমনি অন্য অংশীজনদের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে হবে।

অতীতের নীতিমালার সমালোচনা করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বিগত সময়ে সরকারগুলো গণমাধ্যমকে মূলত নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিতে দেখেছে। এই নিয়ন্ত্রণমুখী ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পুরো গণমাধ্যম খাতে দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার ও অস্বচ্ছতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে নির্দিষ্ট কিছু মহলের অবৈধ আয় কিংবা স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এবং গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে একটি ‘কোয়াসি জুডিশিয়াল কমিশন’ বা আধা-বিচার বিভাগীয় স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তবে এই কমিশন যেন পুনরায় কোনো সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থার ক্রীড়নক না হয়ে ওঠে, সে ব্যাপারেও গভীর সতর্কতা অবলম্বন করার তাগিদ দেন তিনি।

গণমাধ্যম শিল্পে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এই শিল্পে শ্রম আইন, সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা, নিয়মিত বেতন-ভাতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। যেসব প্রতিষ্ঠান এই ন্যূনতম শর্তগুলো পূরণে ব্যর্থ হবে, তাদের লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত বা বাতিল হওয়া উচিত। তবে এই ধরনের শাস্তিমূলক বা নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্ত যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে, সেজন্যই একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কমিশনের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।

সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট টেনে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত ও অভাবনীয় বিকাশের কারণে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজ এখনো পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে ঐতিহ্যবাহী সাংবাদিকতাসহ অনেক পেশার মৌলিক চরিত্র বদলে যাচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করতে হবে।

গণমাধ্যমে ‘কল্যাণমুখী স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার কোনো বিরোধ নেই। বরং নিয়ন্ত্রণহীন ও নৈরাজ্যপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জিত সামাজিক সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তিনি সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এই খাতের উন্নয়নে সব অংশীজনকে একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানান। নবগঠিত ‘টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল’কে একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি ব্রডকাস্টিং ইঞ্জিনিয়ার, ক্যাবল অপারেটর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গেও সমন্বিত আলোচনার পরামর্শ দেন।

উক্ত মতবিনিময় সভায় টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে সংগঠনের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব ও সময় টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ বাবু, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও একাত্তর টেলিভিশনের বার্তা প্রধান শফিক আহমেদ, এবং বৈশাখী টেলিভিশনের বার্তা প্রধান জিয়াউল কবির সুমনসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদ নীতি-নির্ধারকেরা অংশ নেন। বক্তারা গণমাধ্যমের টেকসই রূপান্তরের জন্য সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ