একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজুর মৃত্যু

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজুর মৃত্যু

বাংলাদেশ ডেস্ক

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, সাহিত্য সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহানারা আরজু সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

জাহানারা আরজু ১৯৩২ সালের ১৭ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জের জাবরা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আফিল উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী এবং মাতা খোদেজা খাতুন। তিনি ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। অল্প বয়স থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ প্রকাশ পায়। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই তিনি হাতে লেখা পত্রিকা ‘অঞ্জলি মোর গুঞ্জরণী’ প্রকাশ করেন, যা সে সময়ের সাহিত্যাঙ্গনে আলোচিত হয়।

তাঁর প্রথম কবিতা ১৯৪৫ সালে ‘আজাদ’ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিল’ বিভাগে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা তৎকালীন বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজ ছিল তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য। সহজ-সরল ভাষা ও সাবলীল উপস্থাপনায় তিনি পাঠকমহলে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।

জাহানারা আরজু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৯ সাল থেকে কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে যৌথভাবে পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। সে সময় নারীশিক্ষা, নারী অধিকার ও সাহিত্যচর্চায় পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে তিনি রাইটার্স গিল্ডের পত্রিকা ‘পরিক্রম’-এ যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া টিবি অ্যাসোসিয়েশনের পাক্ষিক ‘হেলথ বুলেটিন’-এর প্রধান সম্পাদক এবং ‘সেতুবন্ধন’ সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘নীলস্বপ্ন’ (১৯৬২), ‘রৌদ্র ঝরা গান’ (১৯৬৪), ‘সবুজ সবুজ অবুঝ মন’, ‘আমার শব্দে আজন্ম আমি’, ‘ক্রন্দসী আত্মজা’, ‘বাদল মেঘে মাদল বাজে’ এবং একুশে ফেব্রুয়ারি বিষয়ক স্বনির্বাচিত কবিতার সংকলন ‘শোণিতাক্ত আখর’ (১৯৭১)। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও সমকালীন সামাজিক বাস্তবতা তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে মোট ২৬টি সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। সাহিত্য সম্পাদনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁকে দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দেয়।

ব্যক্তিগত জীবনে জাহানারা আরজুর স্বামী ছিলেন দেশের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম। তাঁদের চার সন্তান রয়েছেন—বড় ছেলে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, ছোট ছেলে প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিনুল ইসলাম, বড় মেয়ে অধ্যাপিকা মেরিনা জামান এবং ছোট মেয়ে লুবনা জাহান (প্রয়াত)।

মরদেহের প্রথম জানাজা বাদ মাগরিব গুলশানের আজাদ মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় জানাজা বাদ এশা ও তারাবির নামাজের পর মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার খলিলপুর গ্রামে সম্পন্ন হয়। পরে সেখানে স্বামীর কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

জাহানারা আরজুর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে সাহিত্যচর্চা ও সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ