আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গত দুই দশকে ধূমপানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও চীন এর ব্যতিক্রম। ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে সিগারেটের ব্যবহার ২৬ শতাংশ কমলেও একই সময়ে চীনে এর ব্যবহার বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও ব্যবহৃত সিগারেটের প্রায় অর্ধেকই চীনে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০১২ সালে বিল গেটসের সঙ্গে এক আনুষ্ঠানিক বৈঠকে চীনের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ধূমপানকে দেশের অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সে সময় তিনি নিজে ধূমপান ত্যাগের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে প্রায় দেড় দশক পার হলেও দেশটিতে তামাক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান বা কার্যকর অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। বর্তমানে চীনে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি সিগারেট বিক্রি হচ্ছে, যা বৈশ্বিক তামাক বাজারের একক বৃহত্তম অংশ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার পেছনে দেশটির শক্তিশালী তামাক লবি ও রাষ্ট্রীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রভাব সরাসরি দায়ী। চীনের বৃহত্তম সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রায়ত্ত এবং দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান অত্যন্ত গভীর। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তামাক খাত থেকে চীনের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব ও মুনাফা বাবদ জমা হয়েছে প্রায় ২৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট সরকারি আয়ের প্রায় ৭ শতাংশ।
অর্থনৈতিক এই নির্ভরশীলতার কারণে চীনের অনেক প্রদেশ ও স্থানীয় সরকার জনস্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। স্থানীয় অর্থনীতি তামাক করের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় দেশজুড়ে ভবনের অভ্যন্তরে বা পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করার আইনি উদ্যোগগুলো বারবার বাধার মুখে পড়েছে।
যদিও চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তামাক নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনে (এফসিটিসি) স্বাক্ষর করেছে, তবুও চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বাস্তবায়নে দেশটির নীতি নির্ধারকেরা ব্যর্থ হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, উন্নত বা পশ্চিমা দেশগুলোতে সিগারেটের প্যাকেটে যেভাবে সচিত্র ও কড়া স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা ব্যবহার করা হয়, চীনে সেটি অনুপস্থিত। সেখানে প্যাকেটের গায়ে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও অস্পষ্ট সতর্কবার্তা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ভোক্তাদের নিরুৎসাহিত করতে পারছে না।
অবশ্য এই নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা কিছুটা হ্রাসের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ নারী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা ধূমপানের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন। এর ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে ধূমপানবিরোধী কঠোর আইন প্রণয়নের পক্ষে একটি জনমত গড়ে উঠছে।
চীন সরকারের গৃহীত ‘হেলদি চায়না ২০৩০’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ধূমপায়ীর হার বর্তমানের ২৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তামাক খাতের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় নীতি কাঠামোর জটিলতার কারণে দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত দুরূহ হবে।


