অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বাজার মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের তাজা আম রপ্তানির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দীর্ঘ তিন বছরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর আগামী জুন মাসে মালয়েশিয়ার কৃষি বিভাগের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের আম উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা পরিদর্শনে আসছে। প্রয়োজনীয় শর্ত ও মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে চলতি মৌসুমেই মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের আম রপ্তানি শুরু হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি আম রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে হাইকমিশন। মালয়েশিয়ার কৃষি বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য ও কীট-পতঙ্গ ঝুঁকি বিশ্লেষণ (পেস্ট রিস্ক অ্যানালিসিস-পিআরএ) প্রতিবেদন ইতিমধ্যে দেশটিতে পাঠানো হয়েছে। এর পাশাপাশি হাইকমিশন মালয়েশিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন বাণিজ্যিক চেম্বার, আমদানিকারক এবং শীর্ষস্থানীয় সুপারশপ প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সম্পন্ন করেছে।
মালয়েশিয়ার বাজারে আমের ব্যাপক চাহিদা এবং সেখানে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসীর উপস্থিতির কারণে দেশটির আমদানিকারকদের মধ্যে বাংলাদেশি আম নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার ও হাইকমিশনের সক্রিয় প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার কৃষি বিভাগ গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের আমবাগান এবং তাজা ফলের প্যাকিং সুবিধাগুলো যাচাইয়ের (ভেরিফিকেশন অব কমপ্লায়েন্স-ভিওসি) আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়। মালয়েশিয়ার সরকারি বিধি অনুযায়ী, যেকোনো দেশ থেকে তাজা আম আমদানির ক্ষেত্রে পিআরএ সম্পন্ন করার পূর্বশর্ত হিসেবে এই ধরনের সরেজমিন পরিদর্শন বাধ্যতামূলক।
মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আগামী ৭ থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার কৃষি বিভাগের দুই সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে। সফরকালে প্রতিনিধিদলটি দেশের প্রধান আম উৎপাদনকারী অঞ্চল, ফাইটোস্যানিটারি বা উদ্ভিদ সংগনিরোধ ব্যবস্থা, প্যাকিং হাউস, কোল্ড স্টোরেজ এবং রপ্তানি প্রস্তুতি সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প’ এই পরিদর্শনের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে।
বাণিজ্যিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের এই পরিদর্শন বাংলাদেশের ফল রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিনিধিদলটি যদি বাংলাদেশের উৎপাদন ও প্যাকেজিং ব্যবস্থায় সন্তোষ প্রকাশ করে, তবে চলতি মৌসুমেই দেশটির বাজারে বাণিজ্যিকভিত্তিতে আম পাঠানো সম্ভব হবে। এটি বাংলাদেশের কৃষি খাতের জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিতে একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘদিন ধরে রপ্তানি ঝুড়ি বহুমুখীকরণের তাগিদ দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। মালয়েশিয়ার বাজারে আমের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলে তা শুধু কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতেই সহায়তা করবে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও নতুন মাত্রা যোগ করবে। এছাড়া, মালয়েশিয়ার বাজার উন্মুক্ত হলে তা ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতেও বাংলাদেশের ফল ও কৃষিপণ্য রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।


