জাতীয় ডেস্ক
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের কারণে ভেঙে ফেলা ১৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দ্রুত পুনর্নির্মাণের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় স্থাপনের জন্য কোনো শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি যদি জমি দান করেন, তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিজস্ব অর্থায়নে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করবে। একইসঙ্গে জমি দাতার সম্মানার্থে তার নামানুসারে ওই বিদ্যালয়ের নতুন নামকরণ করা হবে। বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকালে সিলেটে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ ঘোষণা দেন। আসন্ন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সিলেট বিভাগের কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে এই সভার আয়োজন করা হয়।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আসন্ন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নকলমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠানের বিষয়ে কেন্দ্র সচিবদের দিকনির্দেশনা দেওয়াই ছিল এই মতবিনিময় সভার মূল উদ্দেশ্য। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও কঠোরতা অবলম্বনের নির্দেশ দেন। তবে আলোচনার এক পর্যায়ে স্থানীয় শিক্ষার অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের পেশাগত সুবিধা ও বঞ্চনার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের কারণে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, মন্ত্রী তার বক্তব্যে সেটি নিরসনের চেষ্টা করেন।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে বিবেচিত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সম্প্রসারণের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এই উন্নয়ন প্রকল্পের অ্যালাইনমেন্টের ভেতরে পড়ায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর ইতোমধ্যে মহাসড়কের পাশের ১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় অপসারণ করেছে। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলে বা স্থাপনা ভাঙা পড়লে, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা এর ক্ষতিপূরণ প্রদান করে থাকে। শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর স্কুলগুলো ভেঙে ফেলেছে। তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে নতুন করে স্কুল নির্মাণ করাটাই হলো সরকারি নিয়ম। তবে এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ।
শিক্ষার্থীদের পাঠদান যাতে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত না হয়, সেজন্য মন্ত্রণালয় একটি বিকল্প ও দ্রুততর সমাধানের কথা ভাবছে বলে জানান ড. মিলন। তিনি বলেন, যদি কোনো শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি এসব বিদ্যালয় স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা দান করেন, তবে মন্ত্রণালয় নিজস্ব বাজেটের মাধ্যমে সেখানে আধুনিক ভবন নির্মাণ করে দেবে। শুধু তাই নয়, দাতাকে সম্মান জানাতে প্রতিষ্ঠানটি তার নামেই করে দেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, ঢাকায় ফিরে মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার প্রসারে বিত্তবানদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সভায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের বর্তমান আর্থিক সংকট নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। শিক্ষামন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বিগত সরকারের আমলের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি জানান, পূর্ববর্তী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শিক্ষকদের এই কল্যাণ ট্রাস্টের বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়ে চরম অনিয়ম হয়েছে। অপরিকল্পিত ব্যয় ও দুর্নীতির কারণে বর্তমানে ট্রাস্টের তহবিলে তীব্র অর্থসংকট বিরাজ করছে, যা একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।
তহবিল শূন্যতার কারণে সারা দেশের হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক চরম অমানবিক জীবনযাপন করছেন বলে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি শিক্ষকদের দুর্দশার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে যাওয়া অনেক শিক্ষক বর্তমানে বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ। তারা নিজেদের জমানো প্রাপ্য অর্থের জন্য আবেদন করে বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করছেন, কিন্তু ট্রাস্ট থেকে কোনো টাকা পাচ্ছেন না। আর্থিক এই বঞ্চনার কারণে অনেক শিক্ষককে শেষ বয়সে এসে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে পড়তে হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, জীবনভর মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করার পর, অর্থের অভাবে অনেককে এখন নিজেদের সন্তানদের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। এমনকি টাকার অভাবে যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিতে না পেরে অনেক শিক্ষকের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে।
তবে এই হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে আশ্বস্ত করেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, কল্যাণ ট্রাস্টের এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে বদ্ধপরিকর। আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষকদের কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য একটি বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানান। এই সংকটকালীন সময়ে তিনি শিক্ষক সমাজকে ধৈর্য ধারণ করার এবং সরকারকে পরিস্থিতি সংশোধনের জন্য কিছুটা সময় দেওয়ার আহ্বান জানান।


