আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও ক্ষমতার কাঠামোয় এক আমূল পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সংকট এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ জেনারেলদের হাতে চলে গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে বড় ধরনের এক সামরিক হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় দেশটির শীর্ষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি প্রাণ হারান। একই হামলায় তার উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। এই ঘটনার পর থেকে মোজতবা খামেনি লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছেন এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বর্তমানে তার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে এবং কেবল চিকিৎসক ও নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরাই তার সান্নিধ্যে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছেন।
নিরাপত্তাজনিত চরম ঝুঁকির কারণে এমনকি রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ থেকে বিরত থাকছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সম্ভাব্য পুনরায় হামলা এড়াতে এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতেই এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। তার সামগ্রিক চিকিৎসা প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করছেন ইরানের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। উল্লেখ্য যে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান পেশাগতভাবে একজন দক্ষ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, যা এই পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, তার জখম বেশ গুরুতর। ইতোমধ্যে তার একটি পায়ে তিন দফায় অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে কৃত্রিম পা বা প্রস্থেটিক প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। এছাড়া তার একটি হাতের কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে, যা বর্তমানে উন্নতির পথে। তবে মুখমণ্ডল ও ঠোঁট মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়ায় তার স্বাভাবিক কথা বলার ক্ষমতা সাময়িকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার অংশ হিসেবে অদূর ভবিষ্যতে তার প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি মানসিকভাবে সক্রিয় আছেন এবং সরাসরি কথা বলার পরিবর্তে লিখিত বার্তার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
নেতৃত্বের এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুভার এখন রেভল্যুশনারি গার্ডসের জেনারেলদের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনি বর্তমানে একটি করপোরেট বোর্ডের চেয়ারম্যানের মতো ভূমিকা পালন করছেন, যেখানে আইআরজিসি-র জেনারেলরা বোর্ড সদস্য হিসেবে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করছেন। দেশটির নির্বাচিত সরকার এবং সিভিল প্রশাসন এখন মূলত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
এই ক্ষমতার রদবদল ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতেও দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে। পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বা কূটনৈতিক তৎপরতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতেন, তা এখন অনেকটাই ম্লান। তার পরিবর্তে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো ব্যক্তিত্বরা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধিকতর প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। এই প্রেক্ষাপট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের নীতি নির্ধারণে এখন সামরিক কৌশলের প্রাধান্য কূটনৈতিক আলোচনার চেয়ে অনেক বেশি।
সামগ্রিকভাবে, ইরানের বর্তমান ক্ষমতার ভারসাম্য এখন সামরিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়েছে। সর্বোচ্চ নেতৃত্বের শারীরিক অনুপস্থিতি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা দেশটির শাসন কাঠামোকে একটি নতুন ও জটিল বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, অদূর ভবিষ্যতে এই সামরিক প্রভাব আরও সংহত হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। আপাতত ইরানের অভ্যন্তরীণ শক্ত অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে।


