জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ঋণের ফাঁদে মধ্যবিত্ত: স্থায়ী সংকটের মুখে নিম্ন আয়ের মানুষ

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ঋণের ফাঁদে মধ্যবিত্ত: স্থায়ী সংকটের মুখে নিম্ন আয়ের মানুষ

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, সীমিত আয় এবং সঞ্চয়ের অভাবের কারণে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বড় অংশ স্থায়ী ঋণের ঝুঁকিতে পড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ সম্পদ বিক্রি ও চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক চাপ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় সক্ষমতা বিনষ্ট করে তাদের দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিগত কয়েক বছরে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি ও আমিষ জাতীয় পণ্যসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিপরীতে সাধারণ চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার ওপর পরিচালিত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আগে যারা সীমিত পরিসরে সঞ্চয় করতে পারতেন, এখন তারা দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মতো ইউটিলিটি বিল বৃদ্ধির ফলে প্রতি মাসেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে ঘাটতি বাজেটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এই অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা খাতের ওপর। পরিবারের কোনো সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে সরকারি চিকিৎসাসেবা অপর্যাপ্ত হওয়ায় বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার শেষ সম্বল চাষের জমি বা বসতভিটা বিক্রি করছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ কেবল চিকিৎসার অতিরিক্ত খরচ বহন করতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। গ্রামীণ ও শহরতলির সুদের কারবারি বা এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানোর ফলে ঋণের একটি চক্র তৈরি হচ্ছে, যা থেকে বের হওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

সামাজিক মর্যাদা রক্ষা এবং পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বিয়ে ও অন্যান্য ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসবের ব্যয় মেটাতে গিয়েও মানুষ সাধ্যের অতিরিক্ত খরচ করছে। গ্রামীণ অঞ্চলে কন্যাসন্তানের বিয়ে বা জরুরি সংকট কাটাতে জমি বিক্রির প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উপার্জনের মূল উৎস বা সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার ফলে এই পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের একটি বড় অংশকে তাদের আপৎকালীন সঞ্চয় বা ডিপিএস ভেঙে জীবনধারণ করতে হচ্ছে। চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা এবং নিত্যপণ্যের অতিরিক্ত মূল্যের কারণে এই তিন খাতে ব্যয়ের চাপ সবচেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সমাজে মানসিক অবসাদ ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ঋণের অতিমাত্রায় চাপ সহ্য করতে না পেরে প্রান্তিক পর্যায়ে আত্মহননের মতো ঘটনাও ঘটছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার চরম বহিঃপ্রকাশ।

এই সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে এবং নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর পরিধি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজারভিত্তিক কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা আবশ্যক, যাতে সাধারণ মানুষকে চড়া সুদের ফাঁদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ