জাতীয় ডেস্ক
দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষগুলো থেকে প্রাথমিক স্তরে সহশিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিল্প, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ করা হবে। সরকারের এই নতুন পরিকল্পনার ফলে আগামী পাঁচ বছরে সংগীত, নৃত্যকলা, চারুকলা, নাট্যকলা ও ক্রীড়া বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে এই খাতের পেশাজীবীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও টেকসই ক্যারিয়ার পাথওয়ে বা পেশাগত উন্নয়নের পথ তৈরি হবে।
বুধবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় এই তথ্য জানানো হয়। দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় সাংস্কৃতিক শিক্ষার সম্প্রসারণ, নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন এবং দক্ষ শিক্ষক তৈরির লক্ষ্যে দেশের ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এই সভার আয়োজন করা হয়। সভায় দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করা এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের ওপর জোর দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন একটি স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তার পাশাপাশি তাদের বৈশ্বিক নাগরিক বা ‘গ্লোবাল সিটিজেন’ হিসেবে গড়ে তুলবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চারুকলা, সংগীত বা ক্রীড়ার মতো বিষয়গুলো কেবল বার্ষিক প্রতিযোগিতা বা সহশিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন এই উদ্যোগের ফলে বিষয়গুলো মূল ধারার পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হবে, যা শিশুদের মননশীলতা ও সৃজনশীলতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সভায় নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও তুলে ধরা হয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ বিষয়ক একটি বিশেষায়িত পাঠ্যবই চালু করা হবে। এই বইটির চারটি মূল অধ্যায়ে চারু ও কারুকলা, সংগীত, নৃত্যকলা এবং নাট্যকলা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পরবর্তীতে ২০২৮ সালের মধ্যে নতুন কারিকুলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বিষয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার একটি বাধ্যতামূলক অংশ হিসেবে রূপ দেওয়া হবে।
তবে এই বিশাল লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত এবং দক্ষ জনবল বা বিশেষায়িত শিক্ষক সংকট। এই সংকট দূর করতে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষকতা-সম্পর্কিত বিশেষ প্রস্তুতি বা প্রশিক্ষণ যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর উদ্দেশ্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা স্নাতক শিক্ষার্থীরা যাতে সরাসরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিশেষায়িত শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হওয়ার উপযুক্ত যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিল্প ও সংস্কৃতির এই অন্তর্ভুক্তি কেবল নতুন কর্মসংস্থানই তৈরি করবে না, বরং সমাজ থেকে অপরাধপ্রবণতা হ্রাস এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ তৈরিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং একটি যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরিতে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।


