সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফ থেকে হামের টিকা কিনছে সরকার

সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফ থেকে হামের টিকা কিনছে সরকার

জাতীয় ডেস্ক

সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) থেকে হামের টিকা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রয়োজনীয় এই টিকা কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত কমিটির এক বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং টিকার জরুরি প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের চলমান হামের প্রাদুর্ভাব বেশ উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৬৬ হাজার ১৭০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৬২ হাজার ২৯২ জন। তবে একই সময়ে হাম এবং এর আনুষঙ্গিক উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে দেশজুড়ে ৬৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৯২ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫৩৯ জনের। বিগত তিন মাসে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত টিকাদানের ঘাটতি বা টিকাদান কর্মসূচিতে এক ধরনের স্থবিরতার কারণে নির্দিষ্ট সময় পর এ ধরনের সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসন আমল থেকে বর্তমান মেয়াদের অন্তর্বর্তী সময়ে টিকা ব্যবস্থাপনায় কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) নিয়মিত টিকা আমদানি করে আসছিল। এই প্রক্রিয়ায় অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও দাতাগোষ্ঠীর সহায়তা। তবে ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই নীতিতে পরিবর্তন আনে। বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এটিকে সরকারের নিজস্ব রাজস্ব বাজেটের আওতায় আনা হয় এবং উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির মাধ্যমে টিকা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

নীতিমালার এই পরিবর্তনের ফলে টিকা আমদানির নিয়মিত প্রক্রিয়ায় এক ধরনের সময়ক্ষেপণ ও জটিলতা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে মাঠপর্যায়ে টিকার ঘাটতি সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। ঢাকায় নিযুক্ত ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স ইতিপূর্বে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, বাংলাদেশে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি নিয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তাদের পক্ষ থেকে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠানো হয়েছিল এবং এই সংকটের টেকসই সমাধানে অন্তত ১০টি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের দুই দিন আগে, গত ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে টিকার ‘আসন্ন ঘাটতি’ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করেছিল সংস্থাটি।

সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা ক্রয়ের সিদ্ধান্তটি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক হলেও, জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়িয়েছে। ফলে বাজারে ও সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকার সরবরাহ সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব ও প্রাণহানির ওপর।

বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে সরকার পুনরায় পূর্বের কার্যকর পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য সংস্থার কাছ থেকে দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, যা মাঠপর্যায়ে চলমান সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত এই অর্থ দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হামের টিকার বড় একটি চালান দেশে আনা হবে এবং দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ