জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে এক মাইলফলক স্পর্শ করে পাবনার ঈশ্বরদীতে নবনির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতি ও কারিগরি ধাপ অতিক্রমের পর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশ এখন পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হলো। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নিরাপত্তা বলয় এবং কারিগরি মানদণ্ড বজায় রেখে এই ঐতিহাসিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) থেকে পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের বা কমিশনিং লাইসেন্স প্রাপ্তির পর থেকেই আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছিল। নিরাপত্তা নির্দেশিকা ও কারিগরি শর্তাবলি নিশ্চিত করার প্রয়োজনে কয়েক দফা সময়সূচি পরিবর্তন করা হলেও, আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই লোডিং প্রক্রিয়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল।
এই মহোৎসব ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নিতে কেন্দ্রটির মূল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভের নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে ঢাকায় পৌঁছেছেন। প্রতিনিধি দলটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে হেলিকপ্টারযোগে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় সরাসরি উপস্থিত হয়ে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন। এ সময় সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামসহ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং বিদেশি পরমাণু বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং সময়সাপেক্ষ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, প্রথম ইউনিটের রিয়্যাক্টরে জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। এই ধাপটি সফলভাবে শেষ হওয়ার পর শুরু হবে বিভিন্ন স্তরের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা। রিয়্যাক্টরের ভেতরে চেন রিঅ্যাকশন বা শিকল বিক্রিয়া শুরু হওয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হবে, যা পরবর্তীতে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করবে।
জাতীয় গ্রিডে এই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের বিষয়টি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমান কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জুলাইয়ের শেষ ভাগে অথবা আগস্টের শুরুতে রূপপুর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ বা আগামী বছরের শুরুর দিকে প্রথম ইউনিটটি তার পূর্ণ সক্ষমতা অর্থাৎ ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু হলে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশের বেশি পূরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও আধুনিক। এখানে রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের প্লাস (Generation III+) রিয়্যাক্টর ‘ভিভিইআর-১২০০’ (VVER-1200) ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিতে রিয়্যাক্টরটি যেকোনো ধরণের মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষম। এছাড়া, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আইএইএ-এর মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই মেগা প্রকল্পটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সংকট নিরসনে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিতেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ইতোমধ্যে ৫৯ জন বাংলাদেশি পরমাণু বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক মানের অপারেটিং লাইসেন্স অর্জন করেছেন, যারা সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা অর্জনের পথে এটি একটি বড় অর্জন।
একবার জ্বালানি লোড করার পর প্রায় দেড় বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে এই কেন্দ্রে। সাধারণত কয়লা বা গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় এটি অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং দীর্ঘমেয়াদী। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইফস্প্যান বা আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর, যা সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব। এর ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে দেশ সুলভ ও কার্বন নিঃসরণমুক্ত স্বচ্ছ জ্বালানি সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিংয়ের এই মুহূর্তটি কেবল একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং বিশ্ব দরবারে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এক অনন্য স্বীকৃতি। জাতীয় গ্রিডে এই বিশাল অংকের বিদ্যুৎ যুক্ত হলে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। রূপপুরের এই অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের উন্নত রাষ্ট্র হওয়ার অভিযাত্রায় একটি শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল।


