ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে তেহরানের ত্রিমুখী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল ট্রাম্প প্রশাসন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে তেহরানের ত্রিমুখী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল ট্রাম্প প্রশাসন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইরানের পক্ষ থেকে পেশ করা নতুন একটি শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের দেওয়া তিন স্তরবিশিষ্ট এই প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে ওয়াশিংটন সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে ইরানের অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।

সম্প্রতি পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান এই নতুন প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠায়। মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই বিষয়ে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাঁর মতে, প্রস্তাবটিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তবে প্রস্তাবটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে।

প্রস্তাবের প্রধান তিন পর্যায়

গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর উত্তেজনা নিরসনে তেহরান এই ‘তিন স্তরবিশিষ্ট’ রূপরেখা প্রণয়ন করে। প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • প্রথম পর্যায়: এই স্তরে বর্তমান যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ও লেবাননের ভূখণ্ডে ভবিষ্যতে আর কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হবে না মর্মে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

  • দ্বিতীয় পর্যায়: প্রথম পর্যায়ের শর্তাবলি মেনে নেওয়া হলে দ্বিতীয় ধাপে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’র ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। কৌশলগত এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো গঠনই এর লক্ষ্য।

  • তৃতীয় পর্যায়: উপরের দুটি ধাপে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হলে কেবল চূড়ান্ত পর্যায়ে ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। তেহরান চায় পরমাণু ইস্যুতে একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি।

ইসলামাবাদ সংলাপের পটভূমি

উল্লেখ্য, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান অচলাবস্থা কাটাতে গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিরা একটি ম্যারাথন বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা ধরে চলা সেই সংলাপে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও কোনো পক্ষই সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াই প্রতিনিধিরা নিজ দেশে ফিরে যান। প্রথম দফার এই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষ ওয়াশিংটন ও তেহরানকে পুনরায় সংলাপে বসার আহ্বান জানায়।

বর্তমান পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ

ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি পুনরায় সংলাপে বসতে চায়, তবে এই নতুন তিন স্তরের প্রস্তাবকেই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবে ওয়াশিংটন শুরুতেই পারমাণবিক ইস্যুতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং স্থায়ী সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, আগে পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন না করে যুদ্ধ বিরতি বা বাণিজ্যিক পথ নিয়ে আলোচনা কার্যকর সুফল বয়ে আনবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক আগ্রাসন বন্ধের শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে যখন ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে, ইরান ধাপে ধাপে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের ওপর আরোপিত চাপ কমাতে চাইছে।

হোয়াইট হাউসের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এটি স্পষ্ট যে, তেহরানের বর্তমান প্রস্তাবটি বর্তমান আকারে গ্রহণ করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নতুন কোনো কূটনৈতিক ফর্মুলার অপেক্ষায় থাকলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের অনমনীয় অবস্থান সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ