আইন ও আদালত ডেস্ক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম ও অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ দ্বিতীয় দিনের মতো জেরা মোকাবিলা করবেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই জেরা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটো তাকে জেরা করবেন। এর আগে সোমবার (২৭ এপ্রিল) এই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত তিন আসামির পক্ষে জেরা সম্পন্ন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। দুলুর জেরা শেষ হওয়ার পর আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো জেরা শুরু করার কথা থাকলেও তিনি প্রস্তুতির জন্য আদালতের কাছে সময় প্রার্থনা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল শুনানি মুলতবি করে আজ মঙ্গলবার পুনর্নির্ধারণ করেন।
এর আগে গত ১৩ এপ্রিল এবং সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল দুই দফায় দীর্ঘ সময় ধরে আযমীকে জেরা করেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। জেরার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর দেওয়া সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাই এবং মামলার বিভিন্ন আইনগত দিক নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন বিবাদীপক্ষের আইনজীবীরা। মূলত দীর্ঘ আট বছরের গুম জীবনের বর্ণনা এবং নির্যাতনের যে অভিযোগ আযমী ইতিপূর্বে আদালতে পেশ করেছিলেন, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইনি যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করা হচ্ছে এই জেরা পর্বে।
সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই আলোচিত মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে এই ১৩ জনের মধ্যে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পরিচালক পদমর্যাদার তিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে বন্দি রয়েছেন। তারা হলেন— মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
মামলার বাকি ১০ জন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের মধ্যে পাঁচজনই বিভিন্ন মেয়াদে ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন— লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক। এ ছাড়া শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা এই মামলার আসামি হিসেবে অভিযুক্ত।
মামলার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, আবদুল্লাহিল আমান আযমী এই মামলায় প্রসিকিউশনের তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। গত ২ ফেব্রুয়ারি তিনি টানা দুই দিনব্যাপী জবানবন্দিতে তার আট বছরের দীর্ঘ ও দুঃসহ গুম জীবনের বিবরণ ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন। তার সাক্ষ্যে আয়নাঘর বা গোপন বন্দিশালায় থাকার সময়কার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বিস্তারিত চিত্র উঠে আসে, যা বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৮ অক্টোবর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাখিলকৃত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তীতে ১৮ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্ত ১৩ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। এই বিচার প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার রোধে একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আজ জেরার পরবর্তী অংশে আসামিপক্ষ তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অংশ হিসেবে আযমীকে কী ধরনের প্রশ্ন করেন, সেদিকেই এখন সবার নজর।


