অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের বাজারে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতার প্রভাবে নিকট ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়াম পণ্যের উচ্চমূল্য, অভ্যন্তরীণ বাজারে দামের সমন্বয় এবং জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। সরকারের জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের মাত্র নয় দিনের মাথায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিশ্লেষণ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাড়তি ব্যয়ের চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬)’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে সার্বিক গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে সরাসরি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। এই বহুমুখী প্রভাবে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।
খাদ্য খাতের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবজি ও মসলার পাশাপাশি মাছ, মাংস এবং ডিমের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ পণ্যের উচ্চমূল্য সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে প্রধান ভূমিকা রাখছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি পোশাক ও পাদুকা খাতের ব্যয়ও বেড়েছে। এছাড়া আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি দেশীয় পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে। যদিও গত মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে এসেছিল, তবে একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি ও মজুরির ব্যবধান সংকুচিত হলেও সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়ায় ক্রয়ক্ষমতা কার্যত হ্রাস পেয়েছে।
জ্বালানিকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব কৃষি থেকে শিল্প—সব খাতেই অনুভূত হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিতে একটি বড় ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমান সরবরাহ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা এই ঝুঁকিকে আরও ঘনীভূত করছে। বিশেষ করে পরিবহন ও সেচ কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচ বাড়লে তা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
এই পরিস্থিতিতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক মুদ্রানীতি এবং কঠোর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজার তদারকি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় কঠোর নীতি গ্রহণ ছাড়া মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


