আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সামুদ্রিক অবরোধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে নিজেদের স্থলপথ বা ট্রানজিট সুবিধা উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। এই সমঝোতার ফলে তেহরান এখন থেকে পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে পারবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অর্থনৈতিক চাপে থাকা ইরানের জন্য একটি বড় স্বস্তি হিসেবে দেখছেন।
দীর্ঘদিন ধরে পারস্য উপসাগরসহ সমুদ্রপথে মার্কিন ও পশ্চিমা দেশগুলোর কড়া নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বহিঃবাণিজ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর সমুদ্রপথে তেহরানের তেল ও পণ্য রপ্তানি কার্যত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের এই ট্রানজিট সুবিধা ইরানকে একটি বিকল্প ও নিরাপদ বাণিজ্যিক রুট সরবরাহ করবে, যা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে।
তবে ইসলামাবাদের এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ওয়াশিংটন যখন ইরানকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার নীতি গ্রহণ করেছে, তখন পাকিস্তানের এই সহযোগিতামূলক অবস্থান মার্কিন চাপকে কতটা শিথিল করবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে এটি গণ্য হবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় চলমান অস্থিরতা নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিদ্যমান বৈরিতা কমাতে ইসলামাবাদ পর্দার আড়ালে কোনো কাজ করছে কি না, সেই গুঞ্জন এখন আরও জোরালো। তবে এই ট্রানজিট সুবিধার ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তেহরানের সঙ্গে জ্বালানি বা বাণিজ্যিক চুক্তি করতে গিয়ে পাকিস্তানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকি এসেছিল।
আঞ্চলিক বাণিজ্যের দিক থেকে বিবেচনা করলে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে এই অঞ্চলের সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যকার এই ভূ-স্থলের সংযোগ পুনরায় সক্রিয় হলে কেবল এই দুই দেশ নয়, বরং মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে বাণিজ্যিক গতিশীলতা ফেরাতে এই ট্রানজিট চুক্তি একটি মাইলফলক হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, পাকিস্তানের এই কৌশলগত অবস্থান ইরানকে যেমন বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা থেকে রক্ষা করার সুযোগ দিচ্ছে, তেমনি পাকিস্তানকে এক জটিল কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া এবং ইসলামাবাদ-তেহরান সম্পর্কের গভীরতাই নির্ধারণ করবে এই অঞ্চলের পরবর্তী নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এখন পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সম্ভাব্য টানাপোড়েন এবং এর প্রভাবে বদলে যাওয়া দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির ওপর।


