শেরেবাংলা নগরে সংবাদকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যু: পারিবারিক অভিমান ও হতাশাকে দায়ী করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন

শেরেবাংলা নগরে সংবাদকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যু: পারিবারিক অভিমান ও হতাশাকে দায়ী করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন

অপরাধ ডেস্ক

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সোবহানবাগ এলাকায় গ্রাফিক্স ডিজাইনার স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত সম্পন্ন করেছে পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার পর পুলিশ তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পারিবারিক অভিমান এবং গভীর মানসিক হতাশা থেকেই তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। গত ১৪ এপ্রিল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে ১৯ এপ্রিল আদালত গ্রহণ করেন।

মামলার নথিপত্র ও পুলিশি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ১৮ অক্টোবর সোবহানবাগের নাভানা টাওয়ারের একটি বাসা থেকে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার দিন বিকেলে পরিবারের সদস্যরা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার পর তিনি নিজ কক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। দীর্ঘক্ষণ কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শেরেবাংলা নগর থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলামের দাখিলকৃত প্রতিবেদনে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঘটনাস্থল থেকে একটি রক্তমাখা ব্লেড, একটি প্রিন্টের ওড়না এবং স্বর্ণময়ীর ব্যক্তিগত নোটবুক ও ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, আত্মহননের আগে তিনি চরম মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধারকৃত ডায়েরি ও চিরকুটে স্বর্ণময়ী তার জীবনের শেষ মুহূর্তের যন্ত্রণার কথা লিখে গেছেন। সেখানে তিনি পরিবারের সাথে তার সম্পর্কের টানাপড়েন, অবহেলা এবং একাকীত্বের কথা উল্লেখ করেন। একটি চিরকুটে তিনি লিখেছেন, পরিবারের কাছে তিনি ‘শুধুই একটি দায়িত্ব’ ছিলেন—এমন অনুভূতি তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। এই গভীর মানসিক হীনম্মন্যতা ও একাকীত্বই তাকে চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে প্রতীয়মান হয়েছে।

মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার সহায়তা নেওয়া হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়, শ্বাসরোধের কারণেই স্বর্ণময়ীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা বা শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। সিআইডির ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় কোনো ধরনের ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। ফলে এটি একটি পরিকল্পিত আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, পুলিশি প্রতিবেদনে এই মৃত্যুর পেছনে কোনো তৃতীয় পক্ষের উসকানি বা সরাসরি প্ররোচনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূলত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষণ্ণতা থেকেই এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত। রাজধানীর আদালত সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্ত কর্মকর্তার দাখিলকৃত চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি বিচারক পর্যালোচনা করে গ্রহণ করেছেন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রের চাপের পাশাপাশি পারিবারিক প্রত্যাশা ও মানসিক সমর্থনের অভাব অনেক সময় বড় ধরনের হতাশা তৈরি করে। স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের এই অকাল মৃত্যু আবারো তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পারিবারিক নিবিড় সম্পর্কের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। পুলিশি প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে এই ঘটনার আইনি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটলেও, এটি কর্মজীবী নারীদের নিরব মানসিক সংগ্রামের এক করুণ আলেখ্য হয়ে রইল।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ