যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবে আমদানিতে রেকর্ড উল্লম্ফন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবে আমদানিতে রেকর্ড উল্লম্ফন

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

ঢাকা: দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০১ শতাংশ বেশি। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আমদানিকৃত মোট পণ্যের ৮৩ শতাংশই ছিল মাত্র ১০টি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে। যার মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), গম, বিমানের ইঞ্জিন এবং সয়াবিন উল্লেখযোগ্য। এই আমদানির বড় অংশই সম্পন্ন করেছে সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলা, খাদ্য অধিদপ্তর এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিশেষত গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, এলপিজি বা গম আমদানি না হলেও এ বছর এসব খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি শুরু হওয়া আলোচনার পর ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এই এআরটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী, বাংলাদেশ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন পণ্যে শুল্ক মওকুফ করেছে এবং আরও ২ হাজার ২১০টি পণ্যে শুল্ক ধাপে ধাপে কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র তন্তু, ওষুধ, রাসায়নিক ও তুলাজাত পোশাকসহ ১ হাজার ৬৩৮টি বাংলাদেশি পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করলেও গড়ে ১৬-১৭ শতাংশ এমএফএন শুল্ক বহাল রেখেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রপ্তানি বৃদ্ধিতে শুল্কের কৌশলগত চাপ ব্যবহার করেছে। গত বছরের এপ্রিলে বাণিজ্য ঘাটতির অভিযোগে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে ঢাকাকে এই চুক্তিতে আসতে হয়। তবে চুক্তির স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্কনীতি বাতিল করায় এবং মালয়েশিয়া একই ধরনের চুক্তি অকার্যকর ঘোষণা করায় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন একটি আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে, বৈদেশিক মুদ্রার বড় ঘাটতি ছাড়া এই ধরনের কড়া বাণিজ্য নীতি প্রয়োগের যৌক্তিকতা ক্ষীণ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চুক্তিতে কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও শিল্প কাঁচামালে বার্ষিক ন্যূনতম আমদানির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলামের মতে, নির্বাচনের আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে করা এই চুক্তিতে বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বা বাজারমূল্য বিবেচনায় না নিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, আমদানিকৃত বেশিরভাগ পণ্যই অত্যাবশ্যকীয় এবং আগে এগুলো অন্য দেশ থেকে সংগ্রহ করা হতো। তবে চুক্তির ফলে এখন আমদানির উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকার পাচ্ছে। আমদানি বৃদ্ধির এই ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য ভারসাম্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয়।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ