অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনাল আগামী ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ওই দিন একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট উড্ডয়নের মাধ্যমে টার্মিনালটির প্রাথমিক কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরিচালনা চুক্তির শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপসহ বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয়ের কারণে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হতে আরও অন্তত নয় মাস সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে জাপানি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে প্রাপ্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হচ্ছে আগামী জুন মাসে। বার্ষিক প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার এই কিস্তি ২০৫৬ সাল পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে। যদিও কিস্তি পরিশোধ দেড় বছর আগেই শুরু হওয়ার কথা ছিল, তবে বেবিচকের অনুরোধে জাইকা চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করেছিল। টার্মিনালটি পুরোদমে সচল হওয়ার আগেই ঋণের এই বিশাল বোঝা কর্তৃপক্ষের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
টার্মিনাল পরিচালনার জন্য গঠিত ‘জাপান কনসোর্টিয়াম’-এর সাথে চুক্তি সই নিয়ে বর্তমানে গভীর দরকষাকষি চলছে। জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, সোজিৎস করপোরেশন ও নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করপোরেশনের সমন্বয়ে গঠিত এই কনসোর্টিয়াম নিট আয়ের ২৫ শতাংশ বেবিচককে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তবে বেবিচক এই হারকে অপর্যাপ্ত মনে করে অধিকতর অংশীদারিত্ব দাবি করছে। যাত্রীসেবা ও কার্গো হ্যান্ডলিং থেকে অর্জিত আয়ের বণ্টন নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর মেহবুব খান জানান, জাপানি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবটি বর্তমান অবস্থায় গ্রহণ করলে বেবিচকের আর্থিক লাভের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক আলোচনায় উভয় পক্ষই লাভজনক অবস্থানে আসার বিষয়ে অগ্রগতি দেখিয়েছে। সমঝোতা হওয়ার পরবর্তী ৪২ দিনের মধ্যে খসড়া চুক্তি এবং তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সই হওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এরপর ‘অপারেশন রেডিনেস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার’ (ওরাট) কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আরও প্রায় ছয় মাস সময় লাগবে। ফলে টার্মিনালটির পূর্ণ সুফল পেতে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এদিকে, টার্মিনালটির গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই বিশাল টার্মিনালে ১-১৫টি চেক-ইন কাউন্টার এবং ৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন ডেস্কসহ আধুনিক সব সুবিধা রয়েছে। এটি পুরোদমে চালু হলে শাহজালাল বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৪০ লাখে উন্নীত হবে। এছাড়া বার্ষিক কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে ১০ লাখ টনে পৌঁছাবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, ১৬ ডিসেম্বরকে লক্ষ্যমাত্রা ধরে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে। বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তাফা মাহমুদ সিদ্দিক আশ্বস্ত করেছেন যে, দেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখেই জাপানের সাথে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদিত হবে। বর্তমানে বেবিচক সদরদপ্তরে এ বিষয়ে নিয়মিত কারিগরি বৈঠক চলছে। ৪ হাজার নিরাপত্তাকর্মীসহ প্রায় ৬ হাজার জনবলের কর্মসংস্থান হতে যাওয়া এই প্রকল্পটি দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে উদ্বোধনের আগে পরিচালনা চুক্তির সফল পরিসমাপ্তিই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।


