অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
জাতীয় বাজেটকে যথাসম্ভব অন্তর্ভুক্তিমূলক করার পাশাপাশি দেশের সব নাগরিককে অর্থনৈতিক মূলধারায় সম্পৃক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, এবারের বাজেটের প্রতিটি বিষয় মূলত একেকটি প্রত্যক্ষ নীতির প্রতিফলন, যার মূল লক্ষ্য দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শামিল করা। একই সঙ্গে দেশের গ্রামীণ কারিগর, শিল্পী ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নির্মাতাদের মতো সৃজনশীল পেশাজীবীদের বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার ওপর জোর দিয়েছে সরকার।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনৈতিক কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক সম্মেলন’-এর একটি অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ‘ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থিতিস্থাপকতার সদ্ব্যবহার’ শীর্ষক এই প্লেনারি সেশনে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী করব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও একটি দক্ষ নীতিনির্ধারণী কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, করনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের করব্যবস্থাকে একটি কার্যকর প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এজন্য একটি বিশেষায়িত ও দক্ষ বিশেষজ্ঞ দল প্রয়োজন, যারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ও করদাতাদের স্বার্থ রক্ষা করে করনীতি পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, নতুন এই ব্যবস্থায় নীতি ও করকাঠামো চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে জনগণের মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করা হবে এবং নীতির সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা হবে।
বাজেটের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রয়োজন ও স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়েই এবারের নীতিগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। কল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রসারের মাধ্যমে যারা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে বা অবহেলিত ছিলেন, তাদের মূলধারায় নিয়ে আসা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতেই সরকার ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমির ধারণাটিকে বাজেটে কার্যকরভাবে যুক্ত করেছে।
বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতির এই সংযোজনকে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দিগন্ত হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের গ্রামীণ কারিগর, নাট্যশিল্পী, গায়ক, ডিজাইনার ও চিত্রশিল্পীরা এতদিন অর্থনীতির মূল স্রোতের বাইরে ছিলেন এবং তাদের কাজের সঠিক আর্থিক মূল্যায়ন হতো না। সরকার এখন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায় যেখানে একজন মৃৎশিল্পী বা তাঁতি সহজ শর্তে ঋণ পাবেন, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পাবেন এবং পণ্যের নকশা ও ব্র্যান্ডিংয়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাবেন। এছাড়া স্থানীয় এই পণ্যগুলো আমাজন বা ইবের মতো বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে ছোট পরিসরে শুরু হলেও ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী শিল্প, সংস্কৃতি, সৃজনশীল সম্পদ এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরও এই সহায়তার আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো আশির দশকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও কেবল সৃজনশীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে আজ বিলিয়ন ডলার আয় করছে এবং নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলেছে। বাংলাদেশও এই পথ অনুসরণ করে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে।
দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী একটি ‘লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচ’ বা জীবনচক্রভিত্তিক ধারণার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একজন নাগরিকের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রাষ্ট্রের একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। সরকার দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার ভিত্তিতে এমন একটি সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তা কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যা মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে স্থায়ী ভূমিকা রাখবে।
উক্ত সম্মেলনে অন্য বক্তারাও বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ খাতের সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করার তাগিদ দেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং বিডার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।


