আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চলমান ফ্রান্স সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত সম্পর্কে নতুন গতিশীলতার সঞ্চার হয়েছে। সপ্তাহব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে ফ্রান্সের নিস শহরে পৌঁছেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ নেতা প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক শক্তি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং যৌথ উদ্ভাবনসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই সফরের পর নরেন্দ্র মোদী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জোট জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং সম্মেলনের সাইডলাইনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তাঁর একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নিস সফরের প্রথম পর্বে দুই রাষ্ট্রপ্রধান যৌথভাবে ‘ভারত ইনোভেটস ২০২৬’ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বিশ্বমঞ্চে ভারতের গভীর প্রযুক্তিগত (ডিপ-টেক) সক্ষমতা প্রদর্শনের লক্ষ্যে আয়োজিত এই সম্মেলনে ১২০টি অগ্রগামী স্টার্ট-আপ এবং ২০টিরও বেশি শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গ্রামীণ উন্নয়ন, টেকসই জীবনযাপন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির রূপান্তরকারী ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন বা ‘গ্লোবাল এআই সামিট’-এ অংশ নিয়ে মানবকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তি উন্নয়নের ওপর জোর দেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ভারতের ক্রমবর্ধমান উদ্ভাবন খাতের প্রশংসা করে এই অংশীদারিত্বকে দুই দেশের ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক ও শিল্প সহযোগিতার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেন।
চলতি বছরের শুরুতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ভারত সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এক বিশেষ বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পর এটিই দুই নেতার মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠক। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সফরে বিশেষ করে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতের যৌথ প্রকল্পগুলো দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সেমিকন্ডাক্টর, বায়োটেকনোলজি এবং ক্লিন অ্যানার্জির মতো ফ্রন্টিয়ার খাতগুলোতে যৌথ বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে এই সফরের মাধ্যমে।
কূটনৈতিক আলোচনার এই গুরুগম্ভীর আবহের পাশাপাশি দুই নেতার মধ্যকার ব্যক্তিগত উষ্ণতা এবং সাংস্কৃতিক সংযোগও বেশ নজর কেড়েছে। নিস সফরের বিভিন্ন কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য মুহূর্তগুলো নিয়ে তৈরি একটি বিশেষ কোলাজ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) এবং ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। ভিডিওটির আবহসংগীত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলিউডের ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র ‘ধুরন্ধর’-এর জনপ্রিয় গান ‘আরি আরি’-র সুর। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপড়েন, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান এবং গোয়েন্দা তৎপরতার পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের সংগীতকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট তাঁর আনুষ্ঠানিক ভিডিওতে স্থান দেওয়ায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এটি বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
ভিডিওটি শুরু হয় দুই নেতার আন্তরিক করমর্দন ও কোলাকুলির মধ্য দিয়ে, যা দুই দেশের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বের প্রতীক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলিউডের এই সুরের অন্তর্ভুক্তি প্রথাগত কূটনীতির বাইরে গিয়ে এক অভিনব আন্তরিকতার মাত্রা যোগ করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন।
উল্লেখ্য, ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই বলিউড প্রীতি এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের শুরুতে নিজের ভারত সফর শেষেও তিনি একটি বিদায়ী ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে একইভাবে ‘ধুরন্ধর’ চলচ্চিত্রের সুর ব্যবহার করা হয়েছিল। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপ্রধানদের এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ কেবল আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও হৃদ্যতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে। প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতার সমান্তরালে এই মনস্তাত্ত্বিক ঘনিষ্ঠতা ভারত ও ফ্রান্সের সম্পর্ককে ভবিষ্যতে আরও দৃঢ় করবে।


