এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ৩৯২৯ কোটি টাকা

এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ৩৯২৯ কোটি টাকা

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে ৪১ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সাল শেষে এই আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা বা ৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁ। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা বা ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ফ্রাঁ। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইটজারল্যান্ডস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি) প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এই আমানতের পরিমাণ এখন পর্যন্ত রেকর্ড হওয়া দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট আমানত ছিল ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা (৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ), যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে এসএনবি জানিয়েছে, এই পরিসংখ্যানটি মূলত সুইস ব্যাংকগুলো কর্তৃক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া সরকারি হিসাবের অংশ। ফলে এটি সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের রাখা কথিত ‘কালোটাকা’ বা অবৈধ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ নির্দেশ করে না।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশের আমানত প্রবাহে ব্যাপক ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৩ সালে যেখানে আমানতের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৬৪ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪ সালে তা এক লাফে বৃদ্ধি পায়। ২০২২ সালে আমানত ছিল ৮২৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ৩ হাজার ২৪৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালেও তার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

খাতসংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, সামগ্রিক আমানত বাড়লেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাংলাদেশিদের আমানত কমেছে। ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত হিসাবের মাধ্যমে রাখা বাংলাদেশিদের আমানত প্রায় ১০ শতাংশ কমে ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১৪ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। বিপরীতে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক আমানত। ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর রাখা আমানত ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ফ্রাঁতে উন্নীত হয়েছে। মোট আমানতের প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর, যা ২০২৪ সালে ছিল ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ ২০২৩ সালে এই হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ছিল ৩৫ শতাংশ।

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর এই বিপুল আমানত বৃদ্ধির বিষয়টিকে স্বাভাবিক ব্যাংকিং প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এই প্রসঙ্গে বলেন, “সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর রাখা অর্থ মূলত স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ। ব্যাংকগুলো সাধারণত কোথায় ভালো মুনাফা পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিনিয়োগের সুযোগ ও রিটার্নের হারের ওপর নির্ভর করে ব্যাংকগুলো নিয়মিত বিভিন্ন দেশে তহবিল স্থানান্তর করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট বছরে সুইজারল্যান্ডে বেশি অর্থ রাখা হয়েছে মানেই সেখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

এদিকে একসময় আমানতকারীর কঠোর গোপনীয়তা রক্ষার জন্য পরিচিত সুইস ব্যাংকগুলো বর্তমানে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অর্থ পাচার ও করফাঁকি রোধে অধিক স্বচ্ছতা নীতি অনুসরণ করছে। এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সাল থেকে ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ (এএইওআই) কার্যক্রম চালু করা হয়। এই ব্যবস্থার আওতায় বিভিন্ন দেশের কর কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক নাগরিকদের আর্থিক হিসাব সম্পর্কিত তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদানপ্রদান করতে পারে। ২০২৫ সালে সুইস ফেডারেল ট্যাক্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফটিএ) বিশ্বের ১০১টি দেশের সঙ্গে প্রায় ৩৪ লাখ আর্থিক হিসাবের তথ্য বিনিময় করেছে।

তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) গ্লোবাল ফোরামের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ এখনো এই আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থায় (এএইওআই) অংশগ্রহণের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এর বিপরীতে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে এই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নিয়মিত তথ্য আদানপ্রদান করছে। আন্তর্জাতিক এই স্বচ্ছতা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের যুক্ত না থাকার কারণে বিদেশে বাংলাদেশিদের প্রকৃত আর্থিক সম্পদের চিত্র পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে আমানতের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভারত। ভারতীয় ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন বা ৩২০ কোটি সুইস ফ্রাঁ, যদিও তা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই অঞ্চলে ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ আমানত নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ এবং বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অন্যদিকে শতকরা হিসাবে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে আফগানিস্তানের, যেখানে আমানত ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ হয়েছে; তবে মোট অঙ্কের দিক থেকে তা খুবই সামান্য।

সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৫ সালে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। এই সময়ে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও ভুটানের আমানত কমলেও বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপের আমানত বেড়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আমানতের সাম্প্রতিক এই উল্লম্ফন মূলত দেশীয় ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক কৌশলের প্রতিফলন। তবে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ