আন্তর্জাতিক ডেস্ক
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের স্ত্রী বেগোনা গোমেজকে দুর্নীতির অভিযোগে জুরি বিচারের মুখোমুখি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। একই সঙ্গে তার সম্ভাব্য পলায়ন ঝুঁকি এড়াতে পাসপোর্ট জব্দ এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গত শনিবার (২০ জুন) মাদ্রিদের একটি আদালতের তদন্তকারী বিচারক হুয়ান কার্লোস পেইনাডো এই আদেশ জারি করেন।
আদালতের জারিকৃত আদেশে বলা হয়েছে, মামলার চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত বেগোনা গোমেজকে প্রতি মাসে দুইবার আদালতে হাজিরা দিতে হবে। তিনি যাতে কোনোভাবেই স্পেন ত্যাগ করতে না পারেন, সে লক্ষ্যে দেশের সব সীমান্ত চৌকি এবং সামরিক ও বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতে জরুরি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। তবে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
২০২৪ সালের এপ্রিলে উগ্র ডানপন্থী ঘরানার একটি দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ‘মানোস লিম্পিয়াস’ (ক্লিন হ্যান্ডস)-এর অভিযোগের ভিত্তিতে বেগোনা গোমেজের বিরুদ্ধে এই প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়। দীর্ঘ দুই বছরের তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগগুলো গঠন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি তহবিল আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রভাব খাটানো এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে অনিয়ম।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাদ্রিদের কমপ্লুটেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষ স্নাতকোত্তর পদ সৃষ্টি এবং তা পরিচালনার ক্ষেত্রে গোমেজ প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে নিজের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন। এছাড়া ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থে সরকারি সম্পদ ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রযুক্তি সংস্থাকে সরকারি চুক্তি পাইয়ে দিতে অবৈধ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই মামলায় গোমেজের পাশাপাশি সুবিধাভোগী একজন ব্যবসায়ী এবং তার অধীনস্থ এক পরামর্শককেও বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং তার স্ত্রী শুরু থেকেই এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট পার্টি এই বিচারিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, বেগোনা গোমেজ গত দুই বছর ধরে পদ্ধতিগত রাজনৈতিক ও বিচারিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং এই আদেশ সেই প্রক্রিয়ারই অংশ। স্পেনের বিচারমন্ত্রী ফেলিক্স বোলানিওস আদালতের এই সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন।
এই আইনি জটিলতা স্পেনের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের পরিবার, সাবেক রাজনৈতিক মিত্র এবং সমাজতান্ত্রিক দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির তদন্ত চলায় সরকারের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ইতোমধ্যে দেশের প্রধান বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং আগাম সাধারণ নির্বাচনের জোর দাবি জানিয়েছে।
বিপক্ষ শিবিরের এই দাবিকে নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ অভিযোগ করেছেন, ইউরোপের অন্যতম বামপন্থী সরকারকে দুর্বল ও ক্ষমতাচ্যুত করতে ডানপন্থী মহল বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে সুপরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে স্পেনের পূর্ববর্তী সরকারের বড় ধরনের দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন পেদ্রো সানচেজ। তবে বর্তমানে তার নিজের ভাই ডেভিড সানচেজ এবং সাবেক পরিবহন মন্ত্রীসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মহামারীকালীন মাস্ক ক্রয় ও পাবলিক ওয়ার্কস চুক্তিতে অনিয়মের পৃথক তদন্ত চলায় বর্তমান সংখ্যালঘু জোট সরকার তীব্র রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেগোনা গোমেজের এই জুরি বিচার আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে স্পেনের রাজনৈতিক সমীকরণে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।


