ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল উরুগুয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এক গভীর কাঠামোগত ও পারফরম্যান্সগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আক্রমণভাগে দলটির দীর্ঘদিনের চালিকাশক্তি লুইস সুয়ারেজের অনুপস্থিতি উরুগুয়ে জাতীয় দলকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কতটা অসহায় করে তোলে, তা ফুটবল পরিসংখ্যান এবং মাঠের পারফরম্যান্সে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করার পর লা সেলেস্তেদের এই কৌশলগত দুর্বলতা এবং ঐতিহাসিক ‘সুয়ারেজ নির্ভরতা’ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত রবিবারে মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে আফ্রিকান দেশ কেপ ভার্দের মুখোমুখি হয়েছিল উরুগুয়ে। ম্যাচের একপর্যায়ে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাক্সি আরাউহো এবং কানোবিওর গোলে উরুগুয়ে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হলেও, রক্ষণভাগের মারাত্মক ভুলের কারণে সেই লিড ধরে রাখতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দের ফরোয়ার্ড হেলিও ভারেলার সমতাসূচক গোলের পর ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ড্রয়ে পরিণত হয়। এই ফলাফলের ফলে প্রতিযোগিতায় উরুগুয়ের জয়হীন থাকার ধারা আরও দীর্ঘায়িত হলো। এর আগে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচেও কোচ মার্সেলো বিয়েলসার শিষ্যরা সৌদি আরবের সাথে ১-১ গোলে ড্র করেছিল। পর পর দুই ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর ফলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে শক্তিশালী স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে লা সেলেস্তেদের ওপর তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও সমীকরণগত চাপ তৈরি হয়েছে।
এই ড্রয়ের পর ফুটবল ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকরা উরুগুয়ে দলের একটি চমকপ্রদ ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান সামনে এনেছেন। ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের পর থেকে লুইস সুয়ারেজকে ছাড়া উরুগুয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল এবং বিশেষ করে বিশ্বকাপ মঞ্চে ম্যাচ জয়ের ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিগত পাঁচ দশকে সুয়ারেজকে ছাড়া উরুগুয়ের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়টি এসেছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে, যেখানে তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে পরাজিত করেছিল। ১৯৯০ সালের পর থেকে উরুগুয়ে যতগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচে জয়ের মুখ দেখেছে, তার প্রায় প্রতিটিতেই স্ট্রাইকার হিসেবে মাঠে উপস্থিত ছিলেন সুয়ারেজ। মাঝের সময়ে ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে উরুগুয়ে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি। ২০০২ বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কোনো ম্যাচ না জিতেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় এবং ২০০৬ সালের জার্মান বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হারায় তারা।
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে উরুগুয়ের ফুটবলে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়, যেখানে লুইস সুয়ারেজ ও দিয়েগো ফোরলানের মতো কিংবদন্তি ফুটবলাররা দলটিকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে চেনান। ২০১০ বিশ্বকাপে চতুর্থ স্থান অর্জন করার পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত উরুগুয়ে প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে এবং এই সুবর্ণ সময়ে দলের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন লুইস সুয়ারেজ। উরুগুয়ে জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে সুয়ারেজ টানা চারটি বিশ্বকাপে (২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২) দলের জয়ে প্রত্যক্ষ অবদান রেখেছেন।
চলমান ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে খেলার তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকারকে কোচ মার্সেলো বিয়েলসার মূল পরিকল্পনায় রাখা হয়নি। ফলে ৯ নম্বর জার্সিধারী এই কিংবদন্তি খেলোয়াড়কে গ্যালারিতে বসেই দলের এই নড়বড়ে পারফরম্যান্স প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সুয়ারেজের বিকল্প হিসেবে তরুণ প্রজন্মকে তৈরি করার যে প্রক্রিয়া, তা এখনো পরিপক্কতা লাভ করেনি।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ফুটবলে কোনো দলের একক কোনো খেলোয়াড়ের ওপর এতটা দীর্ঘকাল নির্ভরশীল থাকা কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে, উরুগুয়ে যেমন সুয়ারেজের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর ভর করে বহু ম্যাচ ড্র বা পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, তেমনি তার অনুপস্থিতিতে দলটি মাঠে খেই হারিয়ে ফেলে। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এবং স্পেনের বিরুদ্ধে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে উরুগুয়েকে এই একক নির্ভরতা কাটিয়ে দলীয় সংহতি ও রক্ষণভাগের দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। অন্যথায়, বিশ্ব ফুটবলের এই সাবেক পরাশক্তিকে টুর্নামেন্টের প্রাথমিক পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হতে পারে।


