অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এই সময়ে প্রবাসীরা মোট ৩০ হাজার ৩২৮ দশমিক ৮১ মিলিয়ন (৩০.৩২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর পরেই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দুই শীর্ষ শ্রমবাজার সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের চতুর্দশ বৈঠকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই তথ্য জানান। সংসদে মন্ত্রীর উপস্থাপিত এই পরিসংখ্যান দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাত বিশেষজ্ঞরা।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। রেমিট্যান্স আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরব থেকে এসেছে ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। এর ঠিক পরপরই তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যেখান থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৪ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। এই শীর্ষ তিন দেশ সম্মিলিতভাবে ১৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার ফলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসার গতি বেড়েছে।
তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যেখান থেকে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। এর পরের অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়া থেকে এসেছে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।
মন্ত্রীর দেওয়া এই পরিসংখ্যান দেশের অর্থনীতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের শ্রমবাজারের একচ্ছত্র আধিপত্যকে আবারও সামনে এনেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইন—এই ছয়টি দেশ থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৩ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার এসেছে, যা মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় ৪৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনশক্তি রপ্তানির সুযোগের ওপর বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভরশীল।
এদিকে প্রথাগত শ্রমবাজারের বাইরে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যেও রেমিট্যান্সের গতি বেশ সন্তোষজনক ছিল। এর মধ্যে ইউরোপীয় অঞ্চলের শীর্ষে রয়েছে ইতালি, যেখান থেকে এসেছে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মধ্যে ফ্রান্স থেকে ৩৩৫ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং গ্রিস থেকে ১৮৫ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলার এসেছে। এ ছাড়া জার্মানি থেকে ১৮০ দশমিক 6২ মিলিয়ন ও পর্তুগাল থেকে এসেছে ১০২ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ডলার।
প্রচলিত ও বৃহৎ শ্রমবাজারের বাইরে অন্য উন্নত দেশগুলো থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রেমিট্যান্স এসেছে, যা প্রবাসী আয়ের উৎস বহুমুখীকরণের ইঙ্গিত দেয়। পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২২৭ দশমিক ০৪ মিলিয়ন ডলার, জাপান থেকে ১০৫ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলার এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে ১৭৭ দশমিক ০৯ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডা থেকে এসেছে ২২৩ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলার এবং মধ্যপ্রাচ্যের জর্ডান থেকে ১৬৮ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।
এর পাশাপাশি আফ্রিকার অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৪০২ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার, মরিশাস থেকে ১৪৩ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। অন্যান্য দেশের মধ্যে মালদ্বীপ থেকে ১৪১ দশমিক ০৯ মিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ব্রুনাই দারুসসালাম থেকে ৮৭ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স প্রাপ্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় একটি স্বস্তির খবর। তবে এই ধারা অব্যাহত রাখতে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বজায় রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন দেশে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক খাতে সুযোগ-সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।


