জাতীয় ডেস্ক
দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের মৃত্যুর হার কমাতে জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) চালুর দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। বক্তারা বলেন, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের সিংহভাগই রাজধানী কেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের রোগীরা সময়মতো উন্নত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই বৈষম্য দূর করতে স্বাস্থ্য খাতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বুধবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন আয়োজিত জাতীয় কনফারেন্সে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কনফারেন্সে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার বর্তমান চিত্র তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে দেশে বিদ্যমান ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক। ভৌগোলিক এই সীমাবদ্ধতার কারণে প্রান্তিক মানুষ জরুরি মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অতীতে এই খাতের কাঠামোগত উন্নয়নে পর্যাপ্ত মনোযোগ না দেওয়ায় বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোর ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগে এক ধরনের স্থবিরতা ও বেহাল দশা বিরাজ করছে।
ডা. জুবাইদা রহমান আরও উল্লেখ করেন, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সিসিইউ বা আইসিইউ সুবিধা না থাকায় বহু গুরুতর অসুস্থ রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা বড় শহরে স্থানান্তরের পথেই প্রাণ হারাতে হয়। এই সংকট উত্তরণে প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে সিসিইউ চালুর তাগিদ দেন তিনি। সঠিক কর্মপরিকল্পনা ও সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে দেশব্যাপী এর পরিসর বাড়ানো সম্ভব হলে রোগীর সামগ্রিক মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে চিকিৎসাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট জনবলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন এবং চিকিৎসকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নির্ভয়ে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ তৈরি করতে চলতি মাস থেকেই দেশের হাসপাতালগুলোতে বিশেষ আনসার বাহিনী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর মাধ্যমে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
একই অনুষ্ঠানে সরকারের বাজেট বরাদ্দের অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, দেশের বিগত ৫৬ বছরের ইতিহাসে স্বাস্থ্য খাতে এবারই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বিপুল বরাদ্দ প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার জনগণের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাজেটের সুপরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে চিকিৎসা অবকাঠামো ব্যবস্থার দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কনফারেন্সে আগত অন্যান্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা দেশের সার্বিক চিকিৎসাব্যবস্থার টেকসই মানোন্নয়নের জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং চিকিৎসক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সিসিইউ পরিচালনার জন্য দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও কারিগরি কর্মকর্তা তৈরি করতে হবে। জরুরি বিভাগের আধুনিকায়ন এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষও বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।


