আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যকার ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক বিরোধ নতুন মোড় নিয়েছে। আসন্ন ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক প্রাক্কালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দুই প্রভাবশালী ডানপন্থী নেতার এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির একটি সম্পাদিত (এডিটেড) ছবি শেয়ার করেন। ছবিতে উনপঞ্চাশ বছর বয়সী মেলোনিকে ট্রাম্পের দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখা যায়। ছবিটির ক্যাপশনে আশি বছর বয়সী ট্রাম্প দাবি করেন, ইতালির প্রধানমন্ত্রী তার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তার নিজের সুরক্ষায় মেলোনির বিরুদ্ধে একটি আইনি নিষেধাজ্ঞা বা ‘রেস্ট্রেইনিং অর্ডার’ জারি করা প্রয়োজন। একই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং মিশেল ওবামাকে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক ছবি পোস্ট করেন।
দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই বিরোধের সূত্রপাত মূলত গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন (গ্রুপ অব সেভেন) সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন, ওই সম্মেলনের সময় মেলোনি তার সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য বারবার অনুনয়-বিনয় করেছিলেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর তীব্র কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখায় ইতালি। ক্ষোভ প্রকাশ করে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তার পূর্বনির্ধারিত ওয়াশিংটন সফর বাতিল করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবিকে ‘সম্পূর্ণ মনগড়া’ এবং বানোয়াট বলে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, ইতালি রাষ্ট্র হিসেবে বা তিনি ব্যক্তিগতভাবে কখনো কারও কাছে অনুনয় করেন না। মেলোনি উল্লেখ করেন, ইতালি আমেরিকার বিরোধী নয় এবং অতীতে যেমন তারা কারও সামনে নতি স্বীকার করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্য বজায় রাখা জরুরি, তবে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সবসময় পারস্পরিক স্পষ্টবাদিতার ওপর নির্ভর করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যক্তিগত বিরোধের নেপথ্যে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত মতপার্থক্য। সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া সামরিক পদক্ষেপে শামিল হতে এবং ওয়াশিংটনকে কৌশলগত সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায় ইতালি। মূলত এই অনীহার পর থেকেই দুই দেশের শীর্ষ নেতার সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে। এছাড়া ইউরোপের জ্বালানি ও অভিবাসন নীতি নিয়ে ট্রাম্পের ক্রমাগত সমালোচনা এবং ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
তুরস্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আসন্ন ন্যাটো সম্মেলনে জোটের অন্য বত্রিশটি সদস্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জর্জিয়া মেলোনি উভেরই উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক এই গুরুত্বপূর্ণ সভার ঠিক আগে দুই দেশের মধ্যকার এই প্রকাশ্য বিরোধ ও কূটনৈতিক উত্তেজনা ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


