জাতিসংঘের ফোরামে জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই শিল্পায়নে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ঘোষণা

জাতিসংঘের ফোরামে জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই শিল্পায়নে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ঘোষণা

জাতীয়  ডেস্ক

জাতিসংঘের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামে (এইচএলপিএফ) জলবায়ু সহনশীলতা, পানি নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক ফোরামে দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হয়।

ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আবদুল আউয়াল। বক্তব্য প্রদানকালে তিনি জলবায়ু অভিযোজন এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অগ্রাধিকার ও সফলতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণভাবে নানা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসের লক্ষ্যে সরকারের একটি বৃহৎ পরিকল্পনার কথা ফোরামে প্রকাশ করা হয়। মুখ্য সমন্বয়ক জানান, সেচ ব্যবস্থা জোরদার করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার এবং দেশের গ্রামীণ ও শহুরে জনগণের জন্য নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করতে সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই উদ্যোগ দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পসহ আন্তঃসীমান্ত নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। বাংলাদেশ মনে করে, অভিন্ন নদীগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য অংশীদারিত্বমূলক উদ্যোগ অপরিহার্য।

এদিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো) বিষয়ক পৃথক এক সেশনে ড. আউয়াল বাংলাদেশের আসন্ন অর্থনৈতিক উত্তরণের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশলের মূল ভিত্তি হিসেবে সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, টেকসই শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মানবসম্পদ উন্নয়নের বিকল্প নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশের প্রতিনিধি জানান, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী কর্মসংস্থানের জন্য তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার বর্তমানে দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা-প্রশিক্ষণ (টিভিইটি), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। এই বিনিয়োগ দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতাক্ষম করে তুলবে।

বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও বৈদেশিক বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে ড. আউয়াল বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বিশেষ করে দেশের কৃষি, জৈব-প্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, চামড়াশিল্প, ডিজিটাল এবং সৃজনশীল শিল্পখাতে বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগ-বান্ধব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এখানে টেকসই ও পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার অনুকূল সুযোগ ও আইনি সুরক্ষা সৃষ্টি করা হয়েছে।

অধ্যাপক আউয়াল তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকারের গৃহীত এই বহুমুখী অভ্যন্তরীণ উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আরও সুসংহত করবে। এটি একদিকে যেমন ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে একটি জলবায়ু সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এসডিজি অর্জনের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে তাঁর বক্তব্য শেষ হয়।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ