জাতীয় ডেস্ক
ঢাকা সফররত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেছেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় উত্তরণের পর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে আরও বিস্তৃত করতে ফ্রান্স প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ফরাসি জাতীয় দিবস বা বাস্তিল দিবস উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত এ মন্তব্য করেন। ফ্রান্স দূতাবাসে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক চরিত্রের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের কাতারে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্রের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি জানান, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তাকে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এই দেশে পাঠিয়েছেন।
দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোকপাত করে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জানান, ফ্রান্স কেবল সরকারি পর্যায়ে নয়, বরং ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিল্পীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদ্যমান বন্ধন আরও মজবুত করতে আগ্রহী। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত বিনিময় এবং উদ্ভাবনী খাতেও ফরাসি বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত জানান, ২০১২ সাল থেকে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি ইউরো ঋণ সহায়তা প্রদান করেছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, এই সহায়তার ৮০ শতাংশের বেশি ব্যয় করা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে। বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নে ফ্রান্সের এই সহায়তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
কৌশলগত ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ফ্রান্স অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় বলে জানান রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে শান্তি, অবাধ নৌচলাচল এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে ফ্রান্স। দুই দেশের সম্পর্কের এই নতুন মাত্রা কেবল প্রচলিত বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা ও সম্পদ সংরক্ষণেও সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রশংসা করতে গিয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের পরবর্তী সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন বলে অভিহিত করেন। এটি বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে বলে তিনি মনে করেন।
সবশেষে, পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের কূটনৈতিক সম্পর্ককে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা দুই দেশের ক্রমবর্ধমান মৈত্রী ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায়কে স্বাগত জানান।


