জাতীয় ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের ২৪তম দিনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার’ শীর্ষক জনগুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই দাবি জানান।
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক তার বক্তব্যে গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত, আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণকারীদের তালিকা প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ প্রদানের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি প্রস্তাব করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেই অর্থ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে ফ্যাসিবাদের বিচার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে জাতীয় পর্যায়ে ঐকমত্য গঠন করা অপরিহার্য, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে গুম, খুন বা দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে না পারে।
বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বিগত শাসনামলের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশল ও ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সরকারের নীলনকশার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল। দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংসের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে তিনি পিলখানা বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতেই পিলখানায় মেধাবী সেনা কর্মকর্তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনী যখন জনবান্ধব অবস্থান নিয়েছে, তখনই জনগণের বিজয় অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামাদের ওপর পরিচালিত অভিযান এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে তার সেনানিবাসের বাসভবন থেকে উচ্ছেদের ঘটনাকে তিনি তৎকালীন সরকারের চরম অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেন।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন; বরং তিনি সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের বর্তমান চিকিৎসা পরিস্থিতির সংকট। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক আহত ও পঙ্গু ব্যক্তি যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে এখনও সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও দায়িত্বশীলরা আহতদের কল্যাণে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন। আহতদের তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা এ প্রক্রিয়ার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অবহেলার দায়ভার নিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হকের এই বক্তব্য জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে, রাষ্ট্র কীভাবে তার প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে—সেই বিতর্ককেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। সংসদীয় এই আলোচনার মাধ্যমে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সঠিক বিচার প্রক্রিয়া ও যথাযথ পুনর্বাসনই হতে পারে শহীদদের প্রতি জাতির শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।


