বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ: চীনা প্রতিষ্ঠানের দখলে দুই-তৃতীয়াংশ শিল্প বিনিয়োগ

বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ: চীনা প্রতিষ্ঠানের দখলে দুই-তৃতীয়াংশ শিল্প বিনিয়োগ

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্জিত বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসেছে চীনা মালিকানাধীন বা যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। গত এক বছরে বেপজার মাধ্যমে মোট ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার বিপরীতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৭১৭.৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২৩টি চীন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব ৪৯৮.৮৬ মিলিয়ন ডলার, যা মোট প্রতিশ্রুতির প্রায় ৭০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের নতুন শিল্প বিনিয়োগে চীনা বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

প্রথাগত তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে এবার চীনা বিনিয়োগের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন বিনিয়োগের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ড্রোন, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস, চিকিৎসা সরঞ্জাম, লজিস্টিকস, তামাজাত পণ্য, স্বয়ংক্রিয় হাইড্রোপনিক কৃষি ব্যবস্থা এবং প্যাকেজিং শিল্পের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাত। ২৩টি চীন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টি সম্পূর্ণ চীনা মালিকানাধীন (হংকংভিত্তিক বিনিয়োগকারীসহ)। বাকিগুলোর মধ্যে চীন-ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, চীন-সিঙ্গাপুর এবং সামোয়া-চীন যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বেপজার জনসংযোগ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এএসএম আনোয়ার পারভেজ জানান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেপজার বিনিয়োগ সেমিনার ও ওয়ান-টু-ওয়ান সংলাপের মাধ্যমে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বহুগুণ বেড়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যমান চীনা বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তির ওপর আস্থা রেখে তাদের উৎপাদন ঘাঁটি এখানে সরিয়ে আনছেন।

চলতি বছরের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর এই বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও বেগবান হয়েছে। এ সফরের ধারাবাহিকতায় বাগেরহাটে ‘চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট ইকোনমিক জোন’ গড়ে তোলার জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন উন্নয়নের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর চীনের ১২টি বড় প্রতিষ্ঠান জ্বালানি, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে মোট ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারার অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, এই বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নে সরকার দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করছে—একদিকে নতুন বিনিয়োগের পাইপলাইন তৈরি, অন্যদিকে বিদ্যমান প্রতিশ্রুতিগুলোকে দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করা। কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ২২ কোটি ডলারের প্রকল্পটিকে এরই মধ্যে একটি নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীনা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় অটল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, নতুন সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর উদ্যোগ চীনা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এই বিনিয়োগ প্রবাহ অব্যাহত রাখতে বিডা চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে নিজস্ব অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি, বিশেষায়িত ‘চায়না ডেস্ক’ এবং চীনা ভাষায় অনলাইন পোর্টাল চালুর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সব সহায়তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের চিত্র আমূল বদলে দেবে। উচ্চপ্রযুক্তি সম্পন্ন শিল্পে চীনা বিনিয়োগের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ