সারাদেশে পৌনে এক কোটি গ্রাহক প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের আওতায়

সারাদেশে পৌনে এক কোটি গ্রাহক প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের আওতায়

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

দেশে কারিগরি বহির্ভূত সিস্টেম লস হ্রাস এবং শতভাগ নির্বিঘ্ন রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে সরকারের চলমান কর্মসূচির আওতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ৮৭ লাখ ৫০ হাজার ৮২৩টি প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার স্থাপন করা হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অবশিষ্ট গ্রাহকদেরও পর্যায়ক্রমে এই প্রিপেইড ও স্মার্ট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম চলমান এই উদ্যোগের বিষয়ে জানান, কারিগরি ও অকারিগরি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের সব বিদ্যুৎ গ্রাহককে স্মার্ট প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও কারিগরি কিছু কারণে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ গ্রাহককে হয়তো এই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব নাও হতে পারে। তা সত্ত্বেও সিংহভাগ গ্রাহককে এই সেবার অন্তর্ভুক্ত করতে কাজ চলছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৫ কোটিরও বেশি বিদ্যুৎ গ্রাহককে পর্যায়ক্রমে আধুনিক স্মার্ট প্রিপেইড মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে একটি সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় মিটারে কারসাজি, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণ এবং বিভিন্ন ধরনের অসাধু অনিয়মের কারণে গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৫ থেকে ৭ শতাংশ কারিগরি বহির্ভূত বিদ্যুৎ অপচয় বা সিস্টেম লস হয়ে থাকে। নতুন প্রিপেইড মিটার স্থাপন করার ফলে এ ধরনের অপচয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ছয়টি প্রধান বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে এই স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ পরিচালনা করছে। জুন মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ ৩৭ হাজার ১২৬টি মিটার স্থাপন করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ১৮ লাখ, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ১০ লাখ ৭৯check হাজার ১৮৪টি এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ৯ লাখ ১৬ হাজার ৯১০টি মিটার স্থাপন সম্পন্ন করেছে। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ৯ লাখ ১২ হাজার ২৩৩টি এবং উত্তরাঞ্চলে নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ৯ লাখ ৩৯ হাজার ৩০৩টি প্রিপেইড মিটার গ্রাহক পর্যায়ে সফলভাবে স্থাপন করেছে।

বিউবোর পরিচালক মো. শামীম হাসান এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে বলেন, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিউবো এককভাবে ৩৫ লাখের বেশি স্মার্ট ও প্রচলিত একক ও তিনফেজ প্রিপেইড মিটার স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নে অবশিষ্ট মিটার স্থাপনের কাজও বর্তমানে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

পাওয়ার সেলের সংগৃহীত সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের প্রতি গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের গড় পরিমাণ ছিল ৬৬১ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এছাড়া দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ২০ মে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত ও সরবরাহ করা হয়, যা ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে একটি বড় মাইলফলক।

ভোক্তা পর্যায়ে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা চালুর ফলে গ্রাহক ভোগান্তি অনেকাংশে কমেছে বলে বিতরণ সংস্থাগুলো দাবি করছে। এই ব্যবস্থায় প্রচলিত বিল পরিশোধের দীর্ঘ লাইন, বকেয়া বিলের কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা পুনঃসংযোগ নেওয়ার মতো প্রশাসনিক ঝামেলা থাকে না। নতুন নিয়মে গ্রাহকদের কোনো ন্যূনতম চার্জ বা অতিরিক্ত জামানত দিতে হয় না এবং মনগড়া বা বিতর্কিত বিল আসার কোনো সুযোগ থাকে না। উপরন্তু, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা প্রচলিত বিদ্যুৎ বিলের হারের ওপর সরকার নির্ধারিত ২ শতাংশ সরাসরি মূল্যছাড় বা রিবেট সুবিধা পেয়ে থাকেন।

কারিগরি সুবিধার পাশাপাশি এই মিটারে মানবিক কিছু ফিচারও যুক্ত করা হয়েছে। অফ-পিক সময়ে কিংবা সরকারি ছুটির দিনে গ্রাহকের ব্যালেন্স শেষ হয়ে এলে বিদ্যুৎ সংযোগ হুট করে বিচ্ছিন্ন হয় না। বরং ব্যালেন্স কমে গেলে মিটার থেকে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয় এবং গ্রাহকরা বিশেষ জরুরি ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে বিদ্যুৎ সেবা সচল রাখতে পারেন। এছাড়া স্মার্ট মিটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দৈনিক ও মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহারসংক্রান্ত সব তথ্য নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করে এবং লাইনে অস্বাভাবিক ভোল্টেজ ওঠানামা প্রতিরোধ করে গ্রাহকের মূল্যবান বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সুরক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ