আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহামের যাত্রা শুরু হলো। গত মাসে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতায় দলের অভ্যন্তরে নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়ে তিনি এই দায়িত্বে আসীন হলেন। আগামী সোমবার রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি যুক্তরাজ্যের টানা এক দশকে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
পার্টির বিশেষ সম্মেলনে বার্নহাম দেশবাসীর মধ্যে নতুন করে আশা সঞ্চারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি এমন এক সময়ে দলের হাল ধরছেন যখন যুক্তরাজ্য দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিতর্কিত নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায়, নতুন সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই দলের নেতা হিসেবে বার্নহামের প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিশ্চিত হয়েছে। দলের ৪ শতাধিক সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৭৯ জনের সমর্থন নিয়ে তিনি তার নেতৃত্বের ভিত শক্ত করেছেন।
গ্রেটার ম্যানচেস্টরের মেয়র হিসেবে টানা তিনবার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বার্নহাম ‘কিং অব দ্য নর্থ’ হিসেবে পরিচিত। তার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দর্শন হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চল, গ্রামীণ ও উপকূলীয় জনপদগুলোর উন্নয়নে তিনি ‘নাম্বার ১০ নর্থ’ নামে একটি কার্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। গত চার দশকের অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তন এনে জনসেবামূলক খাতে রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং পুনঃশিল্পায়নের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সরকার এখন থেকে দোষারোপের রাজনীতির পরিবর্তে সমস্যা সমাধানের রাজনীতিতে মনোনিবেশ করবে।
তবে বার্নহামের সামনে চ্যালেঞ্জের তালিকা বেশ দীর্ঘ। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাকে মন্থর অর্থনীতির চাকা সচল করার পাশাপাশি উচ্চ ঋণব্যয়ের চাপ সামাল দিতে হবে। এছাড়া ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন একটি বড় সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা রিফর্ম ইউকের মতো অভিবাসনবিরোধী দলের জনসমর্থন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এই জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলায় বার্নহামকে স্টারমারের তুলনায় অধিক কার্যকর ও জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষাকারী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।
পররাষ্ট্র নীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও নতুন প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার ফলে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বার্নহাম নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী মূল কর না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ডের ঘাটতি মেটানো এবং সামাজিক কল্যাণমূলক খাতের সংস্কারের মতো কঠিন কাজগুলো তাকে সামলাতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহামের সামনে বড় পরীক্ষা হলো গত ১৪ বছর পর ক্ষমতায় ফেরা লেবার পার্টির প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখা। কিয়ার স্টারমারের শাসনামলে নীতিগত ভুল ও বিতর্কিত নিয়োগের কারণে দলের যে ইমেজ সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্থিতিশীল ও সুসংহত সরকার গঠনই এখন বার্নহামের প্রধান অগ্রাধিকার। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই নতুন নেতৃত্বের যাত্রা ব্রিটিশ রাজনীতিতে কতটুকু স্থায়িত্ব ও উন্নয়ন আনতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


