বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করতে যৌথ প্রচেষ্টার অঙ্গীকার

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করতে যৌথ প্রচেষ্টার অঙ্গীকার

কূটনীতি ও পররাষ্ট্র ডেস্ক

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে এ কূটনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় ও গভীর করতে উভয় দেশ একযোগে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা জানান।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে পরবর্তী ধাপে উন্নীত করার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। সাম্প্রতিক এই বৈঠকটি সংক্ষিপ্ত হলেও দুই দেশের মধ্যে সার্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের সার্বিক পরিস্থিতি বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ সংগ্রহের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা হয়েছে। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সই নয়, দেশের উদীয়মান বেসরকারি বিমানসংস্থাগুলোর মাধ্যমেও যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, যা মূলত দুই দেশের বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক সহযোগিতার একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শুল্ক ব্যবস্থা ও বাণিজ্য নীতি নিয়ে বাণিজ্য ক্ষেত্রে সৃষ্ট উদ্বেগ নিরসনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনি পর্যালোচনার পর মার্কিন বাণিজ্য আইনের আওতায় তদন্ত শেষে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। তদুপরি, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য বিশেষ একটি ‘ট্যারিফ কোটা ব্যবস্থা’ (Tariff Quota System) অনুমোদন করেছে। এই ব্যবস্থার ফলে তৈরি পোশাক খাতে যদি বাংলাদেশি উৎপাদকরা যুক্তরাষ্ট্রের তুলা কিংবা মার্কিন ফাইবার ব্যবহার করেন, তবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আরও বেশি শুল্কমুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবে।

মিয়ানমারের সামরিক সংঘাতের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রশ্নে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবদান তুলে ধরা হয়। বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থী তহবিলে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত মোট মানবিক সহায়তার অর্ধেকেরও বেশি জোগায় যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ আশা প্রকাশ করছে যে এই মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে সংকট সমাধানে বাংলাদেশ যে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন বজায় থাকবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মানবাধিকার ইস্যুতে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে মন্ত্রী জানান, বর্তমান প্রশাসন মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুরক্ষায় সর্বাত্মক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা সংবেদনশীল ইস্যুগুলো নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা চলমান থাকলেও, আলোচ্য বৈঠকে এ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত বা ইস্যু স্থান পায়নি। পুরো বিষয়টি একটি নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক সংলাপের অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

একইসঙ্গে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈশ্বিক এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের বিষয়ে বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) আন্তর্জাতিক উদীয়মান প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে অব্যাহত যোগাযোগ বজায় থাকবে।

সামগ্রিকভাবে, সাম্প্রতিক বৈঠকটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বহুমুখী সম্পর্ক, বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন আশাবাদের বার্তা দিচ্ছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ