আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মরক্কো সীমান্তসংলগ্ন স্পেনের ছিটমহল সিউটায় সম্প্রতি অভিবাসীদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ কেন্দ্র করে পুরো ইউরোপজুড়ে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে স্পেনের সঙ্গে উন্মুক্ত সীমান্তসংক্রান্ত ‘সেনজেন চুক্তি’ স্থগিত করার মতো কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইতালির প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, অনিয়ন্ত্রিত সীমান্ত অনুপ্রবেশ ইউরোপের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে তিনি নিজ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন।
ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উত্তর আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত স্পেনের দুটি ছিটমহল—সিউটা ও মেলিলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র সরাসরি স্থল সীমান্ত রয়েছে এই দুটি অঞ্চলে। ফলে আফ্রিকান মহাদেশ থেকে ইউরোপে প্রবেশের জন্য অভিবাসীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে এই পথটি। এর আগে ২০২১ সালে মরক্কো থেকে একযোগে আট হাজারের বেশি মানুষ প্রবেশ করলে এই সীমান্তে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুতর রূপ ধারণ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে গত বুধবার থেকে। সমুদ্রপথে হাজার হাজার অনথিভুক্ত অভিবাসী একযোগে সিউটায় প্রবেশ করতে শুরু করলে স্থানীয় প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিশাল এই চাপ সামলাতে হিমশিম খায়। সিউটার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস চলমান পরিস্থিতিকে একটি চরম মানবিক ও সামাজিক জরুরি অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব উল্লেখ করে তিনি স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার মাদ্রিদের কাছ থেকে দ্রুত এবং কার্যকর সামরিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
তবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য সংকট মোকাবিলা করা আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে আইনগত ও কূটনৈতিক কারণে। স্পেনের সর্বোচ্চ আদালত সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ার ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এর ফলে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়ে দ্রুত কাউকেই ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, যা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাত অনেকটাই বেঁধে দিয়েছে।
আইনি জটিলতার পাশাপাশি স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। দেশটির প্রধান বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ এবং ডানপন্থী দল ‘ভক্স পার্টি’ বর্তমান পরিস্থিতিকে দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সীমান্ত নীতি ও প্রশাসনিক শিথিলতার তীব্র সমালোচনা করে কেন্দ্রীয় সরকারের পদত্যাগ ও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতেও এর ধাক্কা পৌঁছাতে শুরু করেছে। জার্মানির ডানপন্থী রাজনৈতিক দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) সহ-সভাপতি অ্যালিস ভাইডেল বর্তমান পরিস্থিতিকে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইউরোপীয় অভিবাসন সংকটের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব সীমান্ত সুরক্ষায় অনতিবিলম্বে সব ধরনের মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বের ২৯টি দেশ নিয়ে ইউরোপের ‘সেনজেন এলাকা’ গঠিত। এই চুক্তির অধীনে সদস্য দেশগুলোর নাগরিক ও বৈধ ভ্রমণকারীরা কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ সীমান্ত পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়াই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করতে পারেন। তবে বিশেষ আন্তর্জাতিক সংকট, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া বা গণ-অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা ঘটলে সদস্য দেশগুলোর অস্থায়ীভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার আইনি এখতিয়ার রয়েছে। ইতালির সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারির পর সেনজেন অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অভিবাসন নীতি নতুন করে বড় প্রশ্নের মুখে পড়ল।


