অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমদানি ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া এবং একই সময়ে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দেওয়ায় এক বছরের ব্যবধানে এই ঘাটতি প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে পণ্য আমদানির পেছনে ব্যয় হয়েছে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় এই আমদানি ব্যয় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি, যা ২০২১-২২ অর্থবছরের পর এক বছরে আমদানি বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হার। অন্যদিকে, আলোচিত সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ১ শতাংশ কম। রপ্তানি আয়ের এই পতন এবং রেকর্ড আমদানির যোগফলে বছর শেষে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে। এর আগের অর্থবছর এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২০ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাত্র ১২ মাসের ব্যবধানে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য ঘাটতির এই উল্লম্ফন দেশের বৈদেশিক খাতের মূল কাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। তবে এই সংকট তৈরির পেছনে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা পালন করেছে। গত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত শুল্কনীতি, পশ্চিমা ক্রেতা দেশগুলোতে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট বিঘ্ন রপ্তানি খাতকে চরম প্রতিকূলতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা কমেছে এবং নতুন রপ্তানি আদেশ পাওয়ার হার হ্রাস পেয়েছে। পক্ষান্তরে, কৌশলগত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানির পারদ ঊর্ধ্বমুখী থেকেছে।
বাণিজ্য খাতের এই বড় ধরনের বৈষম্য সত্ত্বেও দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস) বড় কোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহের কারণে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। শক্তিশালী এই প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করেই দেশের চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ঘাটতিকে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের আর্থিক হিসাবেও (ফাইনান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা গেছে। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে ৭৮৯ কোটি (৭.৮৯ বিলিয়ন) ডলার উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৫৯ কোটি ডলার। মূলত সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই), বিদেশী ঋণ গ্রহণ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুদান বৃদ্ধি পাওয়ার ফলেই আর্থিক হিসাবের এই উদ্বৃত্ত প্রসারিত হয়েছে। চলতি হিসাবের নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক হিসাবের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির সমন্বিত প্রভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালেন্স) ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বড় উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে।
তবে বৈশ্বিক লেনদেনের সার্বিক সূচকে উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদরা এই অবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মানতে নারাজ। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে চলতি হিসাবকেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল আকার ধারণ করায় রেমিট্যান্সের ঐতিহাসিক রেকর্ড সত্ত্বেও চলতি হিসাবকে পুরোপুরি উদ্বৃত্তে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি। কেবল একক খাত হিসেবে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে একটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অসম্ভব। বাণিজ্য ঘাটতি সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে অনতিবিলম্বে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, বিকল্প বাজারের সন্ধান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য কৌশলগত নীতি গ্রহণ করা জরুরি।


