অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত বা অপরিবর্তনীয় নয়; প্রয়োজনে এতে সংশোধন, সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, চুক্তির কিছু উপাদান ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদারে সহায়ক হতে পারে।
বুধবার (৪ মার্চ) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শুল্কনীতি এবং চলমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ প্রায় পৌনে তিন বিলিয়ন ডলার। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। অন্যদিকে জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তিপণ্য ও কৃষিজাত সামগ্রী আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য উৎস।
সম্প্রতি ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দেশে যে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়। কিছু ধারা এক পক্ষের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে, আবার কিছু ধারা অন্য পক্ষের অনুকূলে থাকতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। তিনি বলেন, চুক্তিটিকে এ মুহূর্তে সম্পূর্ণ ইতিবাচক বা সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই; এটি একটি রাষ্ট্রীয় সমঝোতা, যা বাস্তব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচ্য।
তিনি আরও জানান, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিই স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় নয়। বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশ, শুল্কনীতি, বিনিয়োগ কাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মার্কিন আদালতে জরুরি ক্ষমতার আওতায় আরোপিত শুল্কসংক্রান্ত একটি রায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি এখনো বিকাশমান এবং সরকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ভিসা বন্ড ইস্যুতে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখছে। সরকার চায়, দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা যেন নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারেন এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হন। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সহজতর ভিসা প্রক্রিয়া ও আস্থাভিত্তিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নন-ট্যারিফ বাধা দূরীকরণ, মান ও সনদসংক্রান্ত জটিলতা হ্রাস এবং বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করেছে। সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ করা গেলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ বাড়তে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাত, উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল বৈচিত্র্যকরণে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র নতুন সরকারের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু পণ্য বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও তা সম্পৃক্ত। এ প্রেক্ষাপটে চলমান সংলাপকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।


