আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। মঙ্গলবার জারি করা এক নির্বাহী আদেশে প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র আসন্ন জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি তুলে ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন।
সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে দ্রুত এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আইনি ক্ষমতা প্রদানের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
এই ঘোষণার অংশ হিসেবে জ্বালানি তেল, খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বণ্টন তদারকির জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের জন্য সরাসরি জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য ক্রয়ের ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে দ্রুত মজুত বৃদ্ধি করা যায় এবং সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।
দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান ব্যবহারের হারে ফিলিপাইনের হাতে মাত্র ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। এই সীমিত মজুত পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে, বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। সরকার আশঙ্কা করছে, পরিস্থিতির অবনতি হলে জ্বালানি সরবরাহে আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফিলিপাইনের জ্বালানি নির্ভরতার একটি বড় অংশই আমদানিনির্ভর। দেশটির মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক যেকোনো সংঘাত সরাসরি দেশটির জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় ফিলিপাইনসহ অনেক আমদানিনির্ভর দেশ চাপে পড়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে দেশটিতে জ্বালানি তেলের মূল্য একাধিকবার বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের মূল্যও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রেসিডেন্টের জারি করা এই জরুরি আদেশ প্রাথমিকভাবে এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এর মেয়াদ বাড়ানো বা প্রয়োজন ফুরালে প্রত্যাহারের ক্ষমতাও রাখা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ ফিলিপাইনের জন্য তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু ফিলিপাইন নয়, অন্যান্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


