জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান

জাতীয় ডেস্ক

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনে বিশ্ব সংস্থার ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ পদে জয়লাভ করেন। নির্বাচনে ড. খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯ ভোট, আর তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পেয়েছেন ৯১ ভোট।

বিশ্বের সর্বোচ্চ বহুপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশের এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতি সদস্য রাষ্ট্রসমূহের আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি জাতিসংঘের অন্যতম শীর্ষ নীতি-নির্ধারণী পদমর্যাদার, যা বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহল মনে করছেন।

এই তাৎপর্যপূর্ণ অর্জনের পেছনে বাংলাদেশের সমন্বিত ও নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় এই নির্বাচনের জন্য মাত্র তিন মাসের মতো সময় অবশিষ্ট ছিল। এত অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রচারণা চালানো ছিল অত্যন্ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ। সাধারণত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন দেশ কয়েক বছর আগে থেকে ধারাবাহিক প্রস্তুতি ও প্রচারণা চালিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদের জন্য প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও, ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে দেশের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

এর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র সাইপ্রাস ২০১৬ সালেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল এবং গত এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়ে আসছিল। বিশেষ করে বিগত এক বছরে ইউরোপীয় এই দেশটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও বিস্তৃত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ মাত্র তিন মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে একটি নিবিড় ও কার্যকর বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচারণা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণার সমতুল্য প্রভাব তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনা ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই স্বল্প সময়ের প্রচারণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। এই কূটনৈতিক প্রচারণার কৌশলগত দিক নির্দেশনায় ১৯৭১ সালের পর ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়ের উদাহরণকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নেওয়া হয়েছিল, যেখানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানকে পরাজিত করে বাংলাদেশ জয়ী হয়েছিল।

সংক্ষিপ্ত সময়ের এই নির্বাচনী প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নিজে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এর পাশাপাশি জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং বিশ্বজুড়ে অবস্থিত বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশন অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রার্থীর ব্যক্তিগত দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এই বিজয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। গত ১৩ মে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের তৎকালীন সভাপতি আনালেনা বায়েরবকের সভাপতিত্বে প্রায় আড়াই ঘণ্টাব্যাপী একটি ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ ডায়ালগ’ বা পারস্পরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ড. খলিলুর রহমান তাঁর দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা ও ‘ভিশন স্টেটমেন্ট’ উপস্থাপন করেন। নির্বাচিত হলে সাধারণ পরিষদ পরিচালনায় তাঁর অগ্রাধিকার, বহুপাক্ষিকতার উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সংকট উত্তরণের রূপরেখা তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন। এই সংলাপটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং এর পরপরই প্রায় ৩০টি রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে, যা বাংলাদেশের বিজয়কে সুনিশ্চিত করে তোলে।

এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রচারণায় মূল গুরুত্ব পেয়েছে বর্তমান বিশ্বের কিছু অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে কার্যকর বহুপাক্ষিকতাবাদের প্রসার, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশসমূহের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়ন এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় অবদান। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণ বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করায় উন্নয়নশীল বিশ্বের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন বাড়ায়। বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ঐকমত্যভিত্তিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে, যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে সমাদৃত হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সমস্ত সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সাথে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, টেকসই উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতিসংঘের মূলনীতি ও সনদের প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ড. খলিলুর রহমানের এই বিজয় বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বকে আরও সুসংহত করবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ