অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
পহেলা বৈশাখের সরকারি ছুটি এবং ই-ভ্যাট (e-VAT) সিস্টেমের আপগ্রেডেশন বা আধুনিকায়নের কারণে সৃষ্ট কারিগরি জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে চলতি এপ্রিল মাসের অনলাইন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়িয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসায়ীরা আগামী ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত কোনো ধরনের বিলম্ব ফি বা জরিমানা ছাড়াই মার্চ মাসের কর মেয়াদের ভ্যাট রিটার্ন অনলাইনে দাখিল করতে পারবেন।
বুধবার এনবিআরের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি দাপ্তরিক আদেশ জারির মাধ্যমে সময়সীমা বৃদ্ধির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। এনবিআরের মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি বিভাগের প্রথম সচিব মো. রুহুল আমিন স্বাক্ষরিত ওই বিশেষ আদেশে বলা হয়েছে, পহেলা বৈশাখে সরকারি ছুটি থাকায় এবং ই-ভ্যাট সিস্টেম আপগ্রেডেশনের কারণে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনকল্পে ই-ভ্যাট সিস্টেমে মার্চ মাসের কর মেয়াদের অনলাইন রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা আগামী ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হলো। মূলত করদাতাদের ভোগান্তি লাঘব এবং রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়াকে বাধামুক্ত রাখতেই এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর বিধান অনুযায়ী, ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পূর্ববর্তী মাসের ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হয়। কোনো কারণে ১৫ তারিখ সরকারি ছুটি থাকলে পরবর্তী কার্যদিবসে রিটার্ন জমার সুযোগ থাকে। তবে এবার এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঈদুল ফিতর এবং পহেলা বৈশাখের টানা দীর্ঘ ছুটি ছিল। ছুটি শেষে অফিস খোলার পর একই সময়ে বিপুল সংখ্যক করদাতা এনবিআরের সার্ভারে প্রবেশ করে রিটার্ন দাখিলের চেষ্টা করেন। এর পাশাপাশি সার্ভারের কারিগরি উন্নয়নের কাজ চলমান থাকায় সিস্টেমে ধীরগতি ও নানা ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে অনেক নিবন্ধিত করদাতা অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে জটিলতার সম্মুখীন হন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য হালনাগাদ করতে ব্যর্থ হন।
ভ্যাট আইনের কঠোর বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা করদাতাকে ১০ হাজার টাকা এককালীন জরিমানা গুণতে হয়। এছাড়া অপরিশোধিত ভ্যাটের ওপর মাসিক ২ শতাংশ হারে বিলম্ব সুদ আরোপের আইনি বিধান রয়েছে। এনবিআরের এই সময় বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের ফলে বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসায়ী অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক জরিমানা এবং আইনি জটিলতার হাত থেকে রক্ষা পেলেন। ব্যবসায়িক মহল এনবিআরের এই সময়োপযোগী ও ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে। তাদের মতে, কারিগরি ত্রুটির কারণে জরিমানা আরোপ করা হলে তা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করত এবং স্বেচ্ছায় কর প্রদানের মানসিকতাকে নিরুৎসাহিত করত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দেশের কর ব্যবস্থাপনা ও আদায় প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ এবং হয়রানিমুক্ত করতে ব্যাপক ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে ই-ভ্যাট সিস্টেম চালু করা হয়। এই আধুনিক সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা এখন ঘরে বসেই অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন (বিআইএন) গ্রহণ, মাসিক রিটার্ন দাখিল এবং ভ্যাট পরিশোধ করতে পারছেন। এনবিআরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের সিংহভাগ ভ্যাট রিটার্ন অনলাইনেই জমা পড়ছে, যা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক। তবে প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই পর্যায়ে মাঝেমধ্যেই সার্ভারে অতিরিক্ত চাপ বা সিস্টেম আপগ্রেডেশনের কারণে সাময়িক ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়। এনবিআরের আইটি বিভাগ নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে সার্ভারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং সফটওয়্যার হালনাগাদ করার কাজ অব্যাহত রেখেছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভ্যাট বর্তমানে সরকারের আয়ের অন্যতম বৃহৎ উৎস। সরকারের বার্ষিক বাজেটের একটি বিশাল অংশ মেটানো হয় এই ভ্যাট খাত থেকে। তাই সুষ্ঠুভাবে ভ্যাট আহরণের জন্য করদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রযুক্তিগত বাধা দূর করে করবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে একদিকে যেমন ভ্যাট ফাঁকির প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ই-ভ্যাট সিস্টেমের চলমান আপগ্রেডেশনের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হলে অনলাইনে রিটার্ন জমার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, সহজ ও নিরাপদ হবে। এর ফলে করদাতাদের সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্ধিত এই সময়ের মধ্যে সকল করদাতাকে তাদের রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য এনবিআরের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।


