আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম মঙ্গলবার জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলায় আগামী ছয় মাসের জন্য দেশটির জরুরি ভিত্তিতে ৫০০ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৫৪০ মিলিয়ন ডলার) অর্থ সহায়তা প্রয়োজন। প্যারিসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই আর্থিক চাহিদার কথা তুলে ধরেন।
ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে ১০ দিনের একটি অস্থায়ী ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলাকালীন লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে এই সহায়তার আহ্বান জানানো হলো। বৈঠকে ফ্রান্সের পক্ষ থেকে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করা হয়।
লেবানন সরকারের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ছয় সপ্তাহের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৪৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৬৫৮ জন। সংঘাতের ফলে দেশটির দক্ষিণ ও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার ফলে জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিরতা শুরুর পরপরই লেবানন সীমান্তে এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
বৈঠক শেষে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ইসরায়েলকে লেবাননের ভূখণ্ডের প্রতি কোনো প্রকার ‘আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ পোষণ না করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে রকেট ও ড্রোন হামলা অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেন। মাখোঁ গুরুত্বারোপ করে বলেন যে, লেবাননের সরকারকেই হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি মনে করেন, উভয় দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে একটি স্থায়ী চুক্তিতে আসা অপরিহার্য, যা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
এদিকে রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে আগামী বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার কথা রয়েছে। গত ১৪ এপ্রিল কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশ দুটির প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এটি দ্বিতীয় দফা আলোচনা। তবে আলোচনার আগে প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম স্পষ্ট করেছেন যে, লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ‘সম্পূর্ণ প্রত্যাহার’ এবং বন্দি ও বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনই তাদের প্রধান দাবি।
প্যারিস বৈঠকের ঠিক আগে লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (ইউনিফিল) এক হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে ফ্রান্সের একজন সেনা সদস্য নিহত এবং তিনজন আহত হন। ফ্রান্স এই হামলার জন্য সরাসরি হিজবুল্লাহকে দায়ী করেছে, যদিও গোষ্ঠীটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে মাখোঁ জানিয়েছেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের মেয়াদ চলতি বছরের শেষে শেষ হতে চললেও ফ্রান্স লেবাননের স্থিতিশীলতা রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক অঙ্গীকার বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তার আবেদন কেবল তাৎক্ষণিক মানবিক ত্রাণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ধস ঠেকানোর একটি প্রচেষ্টা। তবে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রিকরণ এবং সীমান্ত থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো জটিল বিষয়গুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই মানবিক সহায়তার কার্যকারিতা এবং অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে।


