আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান সংশ্লিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার জেরে বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে পানামা খালে জাহাজের আনাগোনা ও চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে নজিরবিহীন জট সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ অপেক্ষার সারি এড়াতে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজ চার মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৪ কোটি টাকা) ব্যয় করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপারের সুযোগ বা ‘স্লট’ কিনে নিয়েছে।
সাম্প্রতিক এক দাপ্তরিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে পানামা খালের ওপর নির্ভরশীলতা কয়েক গুণ বেড়েছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর অস্থিরতা বিবেচনায় নিয়ে অনেক এশীয় জ্বালানি আমদানিকারক এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি সংগ্রহ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল থেকে এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সুয়েজ খালের তুলনায় পানামা খাল অধিকতর নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বিবেচিত হওয়ায় এই রুটটি এখন বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েক মাসে পানামা খাল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০টির বেশি জাহাজ যাতায়াত করছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। সাধারণত জাহাজগুলো যাতায়াতের নির্ধারিত সময় বা স্লট অনেক আগে থেকেই বুক করে রাখে। তবে বর্তমান সংকটে শেষ মুহূর্তের নিলামে বুকিংয়ের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আগে যেখানে নিলামে একটি স্লটের গড় দর ছিল ১ লক্ষ ৩০ হাজার ডলারের কাছাকাছি, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লক্ষ ৮৫ হাজার ডলারে। কিছু ক্ষেত্রে এই দর ৩০ লক্ষ ডলার ছাড়িয়ে গেলেও সম্প্রতি ৪ মিলিয়ন ডলারের নিলামটি সামুদ্রিক বাণিজ্যের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ পানামা খালের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বাজার সংযোগে এটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখন কয়েক হাজার মাইল অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিয়ে হলেও পানামা খালকে বেছে নিচ্ছে। এর ফলে খালের ধারণক্ষমতার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং ৫ থেকে ৭ দিনের দীর্ঘ জট তৈরি হচ্ছে।
এই অতিরিক্ত ব্যয় মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পণ্য পরিবহনে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ব্যয় হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমদানিকৃত এলএনজি বা অন্যান্য জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক না হচ্ছে, ততক্ষণ পানামা খালের এই সংকট ও উচ্চ ব্যয় অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকার সংযোগকারী এই কৃত্রিম জলপথটি এখন কেবল একটি রুট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অন্যতম নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।


