আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওই এলাকায় মাইন স্থাপনরত যেকোনো নৌযান দেখা মাত্র তা গুলি করে ডুবিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীকে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বার্তায় উল্লেখ করেন, “হরমুজ প্রণালির পানিতে মাইন বসাচ্ছে—এমন যেকোনো নৌকা, তা আকারে যতই ছোট হোক না কেন, সরাসরি গুলি করে ধ্বংস করার জন্য আমি মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছি।” এ বিষয়ে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো হবে না বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন। বর্তমানে মার্কিন মাইন অপসারণকারী জাহাজগুলো ওই এলাকায় মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই নির্দেশনাটি এমন এক সময়ে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর শুরু হয়। তবে এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনয়নে ব্যর্থ হয়েছে। বরং একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এই পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা জাগিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্রজাত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই পথে মাইন স্থাপনের অভিযোগ বা পাল্টা হামলার নির্দেশ কেবল সামরিক উত্তেজনা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সরাসরি যুদ্ধের হুমকি যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়া এবং বিশ্বজুড়ে তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া। এর আগে গত কয়েক সপ্তাহে ওই এলাকায় একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ইরানকে দায়ী করে আসছে। যদিও ইরান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌবাহিনীকে দেওয়া এই ‘শ্যুট অন সাইট’ বা দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ ওই অঞ্চলে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি চললেও কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সর্বশেষ অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন উদ্বিগ্ন হয়ে পর্যবেক্ষণ করছে যে, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো—বিশেষ করে পাকিস্তান—এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত করতে নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে কি না। অন্যথায়, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে একটি বড় ধরনের সামরিক সংঘাত এড়ানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।


