পাকিস্তানে জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট

পাকিস্তানে জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

পাকিস্তানে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। দেশটির সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি যথাক্রমে ৬.৫১ রুপি ও ১৯.৩৯ রুপি বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন এই দর বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়ে আগামী ৮ মে পর্যন্ত বহাল থাকবে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পরিপালনের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পাম্প পর্যায়ে হাইস্পিড ডিজেলের (এইচএসডি) নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯৯.৫৮ রুপি, যা আগে ছিল ৩৮০.১৯ রুপি। অন্যদিকে, পেট্রলের দাম ৩৯৩.৩৫ রুপি থেকে বাড়িয়ে ৩৯৯.৮৬ রুপি করা হয়েছে। তবে ডিলার কমিশন এবং পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হওয়ার ফলে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম কার্যত ৪০০ রুপির মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ ও শিল্প খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের উচ্চমূল্য পণ্য পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেবে, যা সরাসরি দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।

তবে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে এবং গণপরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকার ভর্তুকি কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বিশেষ প্যাকেজের আওতায় মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা লিটারপ্রতি ১০০ রুপি পর্যন্ত ভর্তুকি পাচ্ছেন, যার ফলে তাদের জন্য পেট্রলের দাম ৩০০ রুপির কাছাকাছি থাকছে। একজন মোটরসাইকেল চালক মাসে সর্বোচ্চ ২০ লিটার পর্যন্ত এই সুবিধা পাবেন। এছাড়া পণ্যবাহী ট্রাক ও আন্তঃনগর বড় গণপরিবহনগুলোর জন্য মাসে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ রুপি পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে পরিবহন মালিকদের ভাড়া না বাড়ানোর কঠোর নির্দেশ দিয়ে বাজার নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইএমএফ-এর ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলি এবং আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তারা বদ্ধপরিকর। চলতি অর্থবছরে পেট্রলিয়াম লেভি থেকে ১.৪৬৮ ট্রিলিয়ন রুপি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রশাসন। আগামী ৮ মে আইএমএফ বোর্ড সভায় পাকিস্তানের জন্য ১.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ ছাড়ের বিষয়টি অনুমোদিত হতে পারে। এই ঋণ প্রাপ্তির পথ সুগম করতেই সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রয়োজনে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়েও প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্য রক্ষার পরিকল্পনা নিয়েছে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়।

এদিকে, অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি বাহ্যিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ১০ বিলিয়ন থেকে ৬৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়ের নিম্নগতি এবং রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার ফলে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতির হার ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন ও জনজীবনে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশেও প্রশাসনিক স্তরে বড় ধরনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ৩ মে থেকে ৬ মে পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬। সরকারের মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত এই সম্মেলনে এবার মোট ৩৪টি কার্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। মাঠপর্যায়ে সরকারের নীতি বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক গতিশীলতা আনাই এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে আগামীকাল শনিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ পাবেন জেলা প্রশাসকরা।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ