আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিতে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় পাকিস্তানে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সরবরাহ নিশ্চিত করতে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা মূল্যে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটিয়েছে দেশটির সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার পাকিস্তান সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পেট্রোলিয়াম বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ১ মে থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে অর্থনৈতিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
পেট্রোলিয়াম বিভাগের বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে এখন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার হাই-স্পিড ডিজেল ৩৯৯ দশমিক ৫৮ রুপিতে বিক্রি হবে। এর আগে এই জ্বালানির দাম ছিল ৩৮০ দশমিক ১৯ রুপি। অর্থাৎ লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৯ দশমিক ৩৯ রুপি। অন্যদিকে, প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ৩৩৯ দশমিক ৩৫ রুপি থেকে বাড়িয়ে ৩৯৩ দশমিক ৮৬ রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে পেট্রোলের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে দাম বেড়েছে ৬ দশমিক ৫১ রুপি।
মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি কর কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এনেছে ইসলামাবাদ। দীর্ঘ সময় ডিজেলের ওপর কোনো কর আরোপ না থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতি লিটার ডিজেলে ২৮ দশমিক ৬৯ রুপি কর বসানো হয়েছে। তবে পেট্রোলের ক্ষেত্রে কর কিছুটা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগে পেট্রোলের ওপর ধার্যকৃত কর ছিল ১০৩ দশমিক ৫০ রুপি, যা থেকে ৩ দশমিক ৮৮ রুপি হ্রাস করা হয়েছে। এই কর হ্রাসের মূল উদ্দেশ্য ছিল পেট্রোলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা সীমিত রাখা, যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই সংকটের মূল কারণ হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থা। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানির প্রধান এই রুটটি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পাকিস্তান সময়মতো তেল আমদানি করতে পারছে না। আমদানিকৃত তেলের চালান না পৌঁছানোয় মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, যা সরকারকে উচ্চমূল্যে বাজার নিয়ন্ত্রণের পথে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষিকাজ ও পণ্য পরিবহনে বহুল ব্যবহৃত হাই-স্পিড ডিজেলের দাম লিটারে প্রায় ২০ রুপি বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ও পরিবহন খরচ আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই মূল্য বৃদ্ধি কেবল জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি কৃষি উৎপাদন এবং শিল্প কারখানার ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আইএমএফ-এর ঋণের শর্তাবলী এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকটের মধ্যে জ্বালানির এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সরকার মূলত ঘাটতি মেটাতে এবং বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতার প্রভাব সামলাতে ভোক্তাদের ওপর এই অতিরিক্ত খরচের ভার চাপিয়ে দিয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পাকিস্তানে জ্বালানি রেশন করার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত ১ মে থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন দাম কতদিন স্থায়ী হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা কবে নাগাদ নিয়মিত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ী মহল।


