খেলাধূলা ডেস্ক
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত ফিফার ৭৬তম কংগ্রেসে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের ফুটবল কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা পুনরায় প্রকাশ্যে এসেছে। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) সভাপতি জিবরিল রাজুব বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার বৈষম্যবিরোধী নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো করেছেন। একইসঙ্গে ফিফা এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত বা কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট-এ (সিএএস) উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিন।
মঞ্চে অনড় অবস্থান ও কূটনৈতিক শীতলতা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর উপস্থিতিতে কংগ্রেসের মঞ্চে ফিলিস্তিনের জিবরিল রাজুব এবং ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফএ) সহ-সভাপতি বাসিম শেখ সুলাইমান মুখোমুখি হলেও সেখানে চরম কূটনৈতিক শীতলতা বজায় ছিল। ইনফান্তিনোর আহ্বানে উভয় পক্ষ মঞ্চে উপস্থিত হলেও জিবরিল রাজুব ইসরায়েলি প্রতিনিধির সঙ্গে করমর্দন করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। মঞ্চে দাঁড়িয়েই তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দখলকৃত পশ্চিম তীরে বেআইনিভাবে ক্লাব পরিচালনার মাধ্যমে ফিফার সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন।
আইনি লড়াই ও সিএএস-এ আপিল ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিফার কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে তারা গত ২০ এপ্রিল সিএএস-এ একটি আনুষ্ঠানিক আপিল দায়ের করেছে। পিএফএ-র মূল দাবি হলো, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিতর্কিত বা অধিকৃত অঞ্চলে অন্য কোনো দেশের লিগ পরিচালনা ফিফার মৌলিক নীতির পরিপন্থী। তবে সিএএস এখন পর্যন্ত এই আপিলের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক শুনানি বা মন্তব্য প্রদান করেনি।
ফিফার সিদ্ধান্ত ও জরিমানা এর আগে মার্চ মাসে ফিলিস্তিনের দুটি পৃথক অভিযোগের প্রেক্ষিতে ফিফা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিল। পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলোতে ফুটবল ক্লাব পরিচালনা সংক্রান্ত অভিযোগে ফিফার গভর্ন্যান্স প্যানেল জানায়, ওই অঞ্চলের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে জটিল ও অনির্ধারিত হওয়ায় তাৎক্ষণিক কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব নয়। তবে বর্ণবাদ ও বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ১ লাখ ৫০ হাজার সুইস ফ্রাঁ (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা) জরিমানা করা হয়েছে।
ফিফার তিন সদস্যের বিচারক প্যানেল মনে করেন, ইসরায়েলি ক্লাবগুলোর সমর্থকদের মধ্যে উগ্র রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা প্রচারের ক্ষেত্রে আইএফএ নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে। বিশেষ করে বেইতার জেরুজালেম ক্লাবের সমর্থকদের বর্ণবাদী আচরণের বিষয়টি প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ফিলিস্তিনি ফুটবল অবকাঠামো থেকে স্থানীয় খেলোয়াড়দের কৌশলগতভাবে বাদ দেওয়ার অভিযোগটিও প্রমাণিত বলে বিবেচিত হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ফিফা সভাপতির আহ্বান কংগ্রেসে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো উভয় দেশের ফুটবল কর্মকর্তাদের শত্রুতা ভুলে শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “ফুটবল বিভাজন নয়, বরং সেতুবন্ধন তৈরির মাধ্যম হওয়া উচিত।”
তবে জিবরিল রাজুব এই আহ্বানের প্রেক্ষিতে প্রশ্ন তোলেন যে, বারবার ফিফার বিধি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করা একটি দেশের ফিফায় থাকার নৈতিক অধিকার আছে কি না। তিনি বলেন, “আমি আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তবে ফিফার উচিত নিয়ম ভঙ্গের দায়ে ইসরায়েলকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।”
অন্যদিকে, ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইয়ারিভ টেপার সরাসরি বিতর্কে না জড়িয়ে জানান, তারা ফুটবলের প্রসারে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য হলো ফুটবলকে ব্যবহার করে পুরো অঞ্চলের জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের এই ফুটবলীয় বিরোধ কেবল মাঠের খেলাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এখন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও আইনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সিএএস-এর আসন্ন রায় বিশ্ব ফুটবলে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।


